অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলার অনুমতি

২০১০ সালে কাশ্মীর নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধে ইউএপিএ বা সন্ত্রাস দমন আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার অনুমতি দিয়েছেন দিল্লির উপরাজ্যপাল বিনয় কুমার সাক্সেনা। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ইউএপিএ আইন নিয়ে দেশটিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।   

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, বুকার পুরস্কার বিজয়ী অরুন্ধতী ছাড়াও কাশ্মীর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষক শওকত হোসেনের বিরুদ্ধেও ইউএপিএ আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হবে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে দিল্লিতে ‘আজাদি: দ্য অনলি ওয়ে’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিলেন অরুন্ধতী রায় এবং অধ্যাপক শেখ শওকত হোসেন। সেখানে তারা উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ করেছিলেন সুহেল পণ্ডিত নামে এক ব্যক্তি।

একই বছরের অক্টোবরে তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দাখিল করা হয়েছিল।

শওকত হোসেন ও অরুন্ধতী রায়।

সুহেল পণ্ডিতের অভিযোগ, ওই আলোচনা সভায় অরুন্ধতী বলেছিলেন, কাশ্মীর কখনোই ভারতের অংশ ছিলো না এবং ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী জোর করে কাশ্মীর দখল করে রেখেছে।

সবশেষ শুক্রবার উপরাজ্যপালের দপ্তর থেকে জানানো হয়, অরুন্ধতী ও শওকতের বিরুদ্ধে উপরাজ্যপাল ইউএপিএ আইনে মামলা করার অনুমতি দিয়েছেন। 

এদিকে এ খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই নতুন করে উতপ্ত হয়ে উঠেছে ভারতের রাজনীতি। প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস ছাড়াও সিপিএম এবং তৃণমূল এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে নিন্দা জানিয়েছে। 

কংগ্রেস নেতা বি কে হরিপ্রসাদ শনিবার এক্সে বলেন, মানুষের কণ্ঠস্বর চাপা দেয়ার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সেই স্বর যদি কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও আন্দোলনকর্মীদের হয়। 

নিজেদের চূড়ান্ত ব্যর্থতা থেকে জনগণের চোখ সরাতে বিজেপি প্রতিদিন মনগড়া সংকট সৃষ্টি করে চলেছে অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন, বাক্‌স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর এ ধরনের আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। 

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিএম) পক্ষ থেকে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত নিন্দনীয়। ১৪ বছর আগের এক অভিযোগ খুঁচিয়ে বের করে ইউএপিএর মতো কালা-কানুনে মামলা করার অনুমতি দেয়ার পেছনের কারণ একটাই। সেটা স্বৈরতন্ত্রেরই পরিচায়ক।

শাসক দলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র এক্সে বলেন, বিজেপি যদি ভেবে থাকে, ইউএপিএতে মামলা করার মধ্য দিয়ে তারা সেই আগের মতোই চলবে, তা হলে তারা ভুল করবে। তারা কিছুতেই সেই পুরোনো কায়দায় ফিরতে পারবে না। কেননা, এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধেই দেশের মানুষ এবার ভোট দিয়েছে।

বিরোধীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপি মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা এক্সে বলেন, তারা এত চিৎকার-চেঁচামেচি কেন করছে? তারা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য কাঁদছে! ওরা কি কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে না? আফজল থেকে ইয়াকুব, কংগ্রেসের কাছে দেশের আগে জরুরি তার ভোটব্যাংক নীতি।

৬২ বছর বয়সী অরুন্ধতী রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছেন। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নির্যাতন, দুর্নীতি এবং বিতর্কিত নানা আইন নিয়ে তিনি বরাবরই সরব। 

সুজানা অরুন্ধতী রায়ের জন্ম ১৯৫৯ সালে। তিনি ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং আন্দোলনকর্মী। তিনি তার উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংসের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির জন্য ১৯৯৭ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি পরিবেশগত সংশ্লিষ্টতা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও জড়িত রয়েছেন।

ইউএপিএ আইন 

ভারতে যেকোনো ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ করতে ১৯৬৭ সালে ইউএপিএ বা বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন আনা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো, ভারতের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করা।

১৯৬৭ সালের ইউএপিএ আইন অনুযায়ী কোনো সংগঠন সন্ত্রাসী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকলে, সন্ত্রাসী কাজকর্মের প্রস্তুতি নিলে এবং তাদের মাধ্যমে কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদের প্রচার হলে, ওই সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে চিহ্নিত করতে পারত কেন্দ্রীয় সরকার। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি নিয়ে ওই সংগঠনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারত জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ।

কিন্তু বিজেপি সরকার ২০১৯ সালে সেই আইনে পরিবর্তন আনে। যার ফলে শুধুমাত্র সংগঠনই নয়, সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তিকেও সন্ত্রাসবাদী তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করা যাবে। এমনকি বিচারের আগে তদন্ত চলাকালীন ওই ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে এনআইএ। সেক্ষেত্রে আর সংশ্লিষ্ট সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি নিতে হবে না।