ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামাস-ইসরাইল যুদ্ধ এবার লেবাননে বিস্তৃত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির ওপর শকুনের দৃষ্টি পড়েছে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নাগরিকের রক্তে রঞ্জিত ইহুদিবাদী নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে সর্বাত্মক হামলার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ঘোষণায় ফুঁসে উঠেছে লেবানন ও হিজবুল্লাহ। বলেছে, আক্রান্ত হলে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে যাবে ইসরাইল। হিজবুল্লাহর আত্মিক মনোবল আর সামরিক শক্তিকে হিসাবের মধ্যে না রাখলে তেল আবিবকে কঠিন মূল দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লেবাননের শীর্ষ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তারা।
হিজবুল্লাহ প্রধান সাঈদ হাসান নাসরুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকিতে তারা ভীত নন। ভয়ও পায় না। কারণ, শত্রু ভালো করেই জানে যে, তাদের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। সে সঙ্গে আগ্রাসন চালালে ইসরাইলে কপালে কী আছে- সেটা দেশটি জানে।
তিনি আরও জানান, হিজবুল্লাহ একই ইসরাইলকে মোকাবেলায় সক্ষম হবার পরেও, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান- সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাজার হাজার যোদ্ধা লেবাননে যেতে প্রস্তুত। হিজবুল্লাহর প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরাইলবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে মরিয়া তারা। এভাবে প্রায় এক লাখ যোদ্ধা পেতে পারে সংগঠনটি।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরাইল যদি লেবাননে উত্তেজনাকর সংঘাত থেকে সরে না যায়, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে। আর সেটি হলে হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় এক লাখ যোদ্ধা। এসব যোদ্ধারা এরইমধ্যে বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে ঘাঁটি গেড়েছে।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজায় ইসরাইল হামলা শুরুর পর থেকেই ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা শুরু করে হিজবুল্লাহ। এরপর থেকে উত্তর ইসরাইলের সঙ্গে লেবানন সীমান্তে প্রায় প্রতিদিনই গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটছে। আর চলতি মাসে ইসরাইলের উত্তরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
গত দশকে লেবানন, ইরাক, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের ইরান-সমর্থিত যোদ্ধারা সিরিয়ায় ১৩ বছরের সংঘাতে একযোগে যুদ্ধ করেছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বলছে, তারা আবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে এক হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিদেশি যোদ্ধারা এক হলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হবে যুদ্ধ।
হিজবুল্লাহর নেতা নাসরাল্লাহ জানিয়েছেন, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ বহু দেশ থেকে কয়েক হাজার যোদ্ধা পাঠানোর প্রস্তাব তারা পেয়েছেন। এতে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে হিজবুল্লাহর প্রধান বলেছেন, আমাদের কাছে যে বিপুল সংখ্যক যোদ্ধা রয়েছে তাতে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী।
আপাতত নিজের এক লাখ যোদ্ধা নিয়েই ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন নাসরাল্লাহ। সেই সঙ্গে পাঁচ লাখ রকেট-মিসাইল আর ড্রোন ইসরাইলের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমান হিজবুল্লাহ তার শক্তির ক্ষুদ্র অংশই ব্যবহার করছে। যারা মূলত মিসাইল ও ড্রোন নিক্ষেপকারী বিশেষ যোদ্ধা।
ইরান সমর্থিত লেবানিজ ও ইরাকি গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা বলছেন, লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হলে আশপাশের অঞ্চল থেকে যোদ্ধারা যোগ দেবেন। এমন হাজার হাজার যোদ্ধা ইতোমধ্যেই সিরিয়ায় মোতায়েন রয়েছেন। তারা সহজেই গোপনে সীমান্ত দিয়ে লেবাননে পৌঁছে যেতে পারেন।
অবশ্য হিজবুল্লাহ বিশেষজ্ঞ কাসিম কাসির বলেন, বর্তমানের যুদ্ধের বড় অংশই উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর। আর এর জন্য বিপুল সংখ্যক যোদ্ধার প্রয়োজন নেই। তবে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হলে এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে চললে হিজবুল্লাহকে লেবাননের বাইরে থেকে সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে।
লেবাননে অন্য দেশ থেকে যোদ্ধা আসতে পারে, সে ব্যাপারে ইসরাইলও সতর্ক রয়েছে। হিজবুল্লাহর ডেপুটি লিডার নাইম কাসেম বলেছেন, এই যুদ্ধ ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষতির কারণ হবে। যদি, বিদেশি যোদ্ধা যোগ দেয়, তাহলে তা হবে ইতিবাচক। সেক্ষেত্রে ইসরাইল বেশিদিন যুদ্ধক্ষেত্রে টিকতে পারবে না।
এর আগে, ইসরাইল-হিজবুল্লাহ সবশেষ বড় আকারের সংঘাত হয়েছিলো ২০০৬ সালে। তখন, ইসরাইলকে নাজেহাল বানিয়ে ছাড়ে হিজবুল্লাহ। এবার লেবানন পাশে পাচ্ছে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স, আফগানিস্তানের ফাতিমিয়ুন, পাকিস্তান জেইনাবিয়ুন এবং ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধা। তাই সাধু সাবধান!