আরজিকর হাসপাতালের চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে কলকাতা। বিচাররের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে টলিউড থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের মানুষও। কারো কারো মুখে জোরালো হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের দাবিও।
তবে দুর্বৃত্তের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে খোদ তৃণমূল কংগ্রেস। চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চের সামনে ধরনায় বসেছেন কলকাতা মেয়র ফিরহাদ হাকিমও। অভিযোগ আসছে, এনিয়ে সোশ্যালে ছাড়ানো হচ্ছে গুজবও।
রোববার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া বিভিন্ন গুজব ছড়ানো উচিত নয়, ইনভেস্টিগেশন করতে দেয়া উচিত। প্রশাসনের দিক থেকে যা যা করার আমরা করেছি।
এদিকে দুর্বৃত্তদের শাস্তির দাবিতে কলকাতায় টলিউডের শিল্পী, পরিচালকরা মিছিল করেছেন। যদিও আরজিকর চত্বরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে পুলিশ।
মিছিলে রাজ চক্রবর্তী, শুভশ্রী গাঙ্গুলী, শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি অরিন্দম শীল, চূর্ণী গাঙ্গুলী, কৌশিক সেন, পাওলি দাম, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়, রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ ঐন্দ্রিলা সেন, অঙ্কুশ হাজরা, রূপাঞ্জনা, শান্তিলাল মুখার্জি, ইমন চক্রবর্তী, জিতু কামাল, সৃজিত মুখার্জিসহ অন্য শিল্পী ও পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন ।
অপরদিকে, বিকেলে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সামনে ফুটবলপ্রেমীরা ‘বিচার চাই’ দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কয়েক জনকে আটক করে। ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। সন্ধ্যায় রাজ্য জুড়ে বিক্ষোভ করে বাম সংগঠনের সদস্য এবং সাধারণ জনতা।
এদিকে আরজিরকরকাণ্ডে সোশ্যালে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে প্রায় এক হাজার নেটিজেনকে চিহ্নিত করেছে কলকাতা পুলিশ।
রোববার লালবাজার সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে তাদের নোটিশ পাঠানোর কাজও শুরু করা হয়েছে। ডেকে পাঠানো হয়েছে তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়কে। এর আগে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে লালবাজারে ডেকে পাঠানো হয়েছে নেটিজেনদের কয়েকজনকেও।
সূত্রের দাবি, তাদের ছড়ানো তথ্যের বিশদ জেনে ডেকে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে লালবাজারে।
রোববার রাত ১০টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার ওই চিকিৎসকের ডায়েরি থেকে ‘ছেঁড়া পাতা’-র ছবি বাবার কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার। সংবাদমাধ্যমটির বরাতে জানা গেছে, সিবিআই চাইলে তিনি তা দিতে প্রস্তুত। তবে ডায়েরি সেই ছেড়া পাতা কী লেখা আছে তা তিনি বিস্তারিত জানান নাই।
এর আগে শনিবার কলকাতার আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবিতে এবার পথে মিছিল করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
পরে এক সংক্ষিপ্ত সভায় মমতা বলেন, ফাঁসির দাবিতে ‘রাম-বাম’ এর চক্রান্তের বিরুদ্ধে মিছিল করবেন। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক।
গত ৯ আগস্ট এই হাসপাতালেরই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ এবং খুন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায় হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. সন্দীপ ঘোষের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ঘরে বাইরে চাপের মুখে পড়ে অবশেষে ঘটনার তিন দিন পর অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। তবে সকালে পদত্যাগের পর বিকেলে তাকে কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিয়োগ দেয় রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। আর তারপর থেকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজেও শুরু হয় বিক্ষোভ।
শুক্রবার ডা. সন্দীপ ঘোষকে আটক করে সিবিআইয়ের আঞ্চলিক দপ্তর কলকাতার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেখানেই চলছে টানা জিজ্ঞাসাবাদ।
কলকাতা পুলিশ ও গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেইনি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ওই পোস্টগ্র্যাজুয়েট ছাত্রী। দিবাগত রাত দুইটায় বাইরে থেকে খাবার এনে নৈশভোজ সারেন আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে। এরপর তিনি জরুরি বিভাগ ভবনের চারতলার একটি সেমিনার কক্ষে বিশ্রাম নিতে যান। পরদিন শুক্রবার সকাল আটটা নাগাদ তার নিথর দেহ দেখতে পান হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই ছাত্রীর বাড়িতে ফোনে খবর দিয়ে জানিয়ে দেয়, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ছুটে আসেন হাসপাতালের জুনিয়র-সিনিয়র চিকিৎসকেরা। তারা অর্ধনগ্ন মরদেহ দেখে অভিযোগ করেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে। শুরু হয় চিকিৎসকদের আন্দোলন।
চিকিৎসকেরা দাবি তোলেন, ওই চিকিৎসক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত, হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সোদপুরে বাড়ি ওই ছাত্রীর। মা–বাবার একমাত্র সন্তান ওই চিকিৎসক। তিনি এমবিবিএস পাস করার পর আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে চেস্ট মেডিসিন বিভাগে পোস্টগ্র্যাজুয়েট করছিলেন। ছিলেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।