আসাদ কি সত্যি পালিয়ে গেছেন, কোথায় গেলেন?

আক্রমণ শুরু করার মাত্র ১৬ দিনের মাথায় সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ এখন বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে। সেই সঙ্গে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের ২৪ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে। বিদ্রোহীরা দামেস্কে প্রবেশের আগেই প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এর আগে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যান।

দুই সিনিয়র সিরিয়ান কর্মকর্তা জানিয়েছে, একটি বিমানে চড়ে দামেস্ক ছেড়ে অজানা গন্তব্যে চলে গেছেন বাশার আল-আসাদ। তবে তিনি কোথায় গেছেন তা জানা যায়নি।

লন্ডনভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ছেড়ে গেছে। সেই উড়োজাহাজে আসাদ থাকতে পারেন। ওই উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের পর বিমানবন্দর থেকে সরকারি সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

কিন্তু সেই উড়োজাহাজে চেপে বাশার আল-আসাদ কোথায় গিয়েছেন, তা এখনও অস্পষ্ট। তার মাঝেই খবর এসেছে আসাদের বিমান আকাশপথে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! তবে কি আসাদের বিমান ভেঙে পড়ল? মৃত্যু হয়েছে আসাদের? শুরু হয়েছে জল্পনা। যদিও কোন কিছুরই আনুষ্ঠানিক কোন ভাষ্য নেই। 

অনেকেই দাবি করেন, বাশারের বিমান গুলি করে নামানো হয়েছে! যদিও এই সব খবরের সত্যতা প্রকাশ্যে আসেনি। বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা সিরিয়ার সরকারের তরফে কোনো বিবৃতি জারি করা হয়নি। উল্টো বিদ্রোহীদের সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের নেতারা। 

উড়োজাহাজের অনলাইন ট্র্যাকার সংক্রান্ত একটি ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ার একটি উড়োজাহাজ দামেস্কের বিমানবন্দর থেকে উড়েছিল সকালে। প্রথমে দেখা যায় সেটি সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। পরে আকস্মিকভাবেই হোমস শহর পার হতেই আর কোন খোঁজ নেই সেটির। 

রয়টার্স জানাচ্ছে, বিদ্রোহীরা রাজধানী দখল করার খবর পাওয়ার পর সিরিয়ান এয়ারের একটি উড়োজাহাজ দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। সেটি প্রাথমিকভাবে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে উড়ে যায়। কিন্তু তারপর উড়োজাহাজটি হঠাৎ করে ইউটার্ন নেয় এবং রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। 

তবে, রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি কে ছিলেন বিমানটিতে। আকাশপথে উড়োজাহাজ অদৃশ্য হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। হতে পারে ওই উড়োজাহাজের ‘জিপিএস জ্যামিং’ এর কারণে সেটির গতিবিধি সম্পর্কিত তথ্য মেলেনি।

অনেকের মতে, দামেস্ক থেকে উড়োজাহাজটি রাশিয়ার দিকে যাচ্ছিল। সেখানেই নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন বাশার। আবার কেউ কেউ বলছেন, দেশ ছেড়ে নাও পালাতে পারেন তিনি দেশের মধ্যে যে সব এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে নয়, সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। 

তবে কোনো সূত্রই বাশারের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করেনি। যদিও শনিবার প্রেসিডেন্ট বাশারের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু বিদেশি গণমাধ্যমে গুঞ্জন ও ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট দামেস্ক ছেড়েছেন বা দ্রুত অন্য দেশে চলে গেছেন। কিন্তু তা সত্য নয়। প্রেসিডেন্ট জাতীয় ও সাংবিধানিক কাজে ব্যস্ত রয়েছেন ও রাজধানী দামেস্কেই আছেন।

পরে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসাদ এখন সম্ভবত দেশের বাইরে। কিন্তু আসাদ কোথায় থাকতে পারেন তা তিনি জানাননি। আবার একইভাবে আসাদ আবুধাবিতে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করেছেন কিনা সেটি নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনটিই করেননি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ এক কূটনীতিক।

কেবল আসাদই নয়, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান কোথায় আছে সেটিও এখনও অজানা। তবে সিরিয়া ছাড়ার পর ইরান কিংবা রাশিয়ায় যাওয়া ছাড়া আসাদের বিকল্প নেই এমনটিই ধারণা করা হচ্ছে। সিরিয়ার বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখলের কয়েকঘণ্টা পরই বাশার আল-আসাদের মিত্র রাশিয়া জানায়, তিনি পদত্যাগ করে সিরিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। এর চেয়ে আর বেশি কিছু জানায়নি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত শুক্রবার দামেস্কে আসাদের সঙ্গে দেখা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একজন উপদেষ্টা। প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, উপদেষ্টা আলি লারিজানি আসাদকে ইরানের সমর্থন জানাতে সাক্ষাৎ করেছেন। অনেকে ধারণা করছেন, আসাদ শেষ পর্যন্ত ইরানের আশ্রয় নিতে পারেন।

২০১১ সালের মার্চে আসাদ বিরোধী ব্যাপক গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সিরিয়াতে অস্থিতিশীলতার শুরু। এরপর সেখানে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পরবর্তীতে সেসব বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন আসাদ। তবে সিরিয়া এখনো একটি বিভক্ত দেশ।  

বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের গভীর ক্ষত এখনো দগদগে। গত চার বছর ধরে যে অচলাবস্থা এবং স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল, তা মাত্র দেড় সপ্তাহ আগে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিদ্রোহীরা হঠাৎ করেই কঠোর আঘাত করেছে, ফলে আসাদ বাহিনী প্রতিঘাত বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সিরিয়া আরও বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে যেতে পারে। কারণ সেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একে অপরের সঙ্গে লড়াই করবে। ইতিমধ্যে অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে এই পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।