কথায় বলে স্বৈরশাসকের পেটে স্বৈসাচারীই জন্ম নেয়। সিরিয়ার সদ্য পতিত স্বৈরাচারী শাসক বাশার আল-আসাদও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। বাবার হাফিজ আল-আসাদের মতোই লৌহ কঠিন হাতে দুই যুগ সিরিয়া শাসন করে গেছেন। নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতায় ছাড়িয়ে গেছেন তার সকল পূর্বসূরিকে।
টানা পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সিরিয়া শাসন করছে আসাদ পরিবার। এর মধ্যে ১৯৭১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাফিজ ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর ওই বছরই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তাঁর ছেলে বাশার আল-আসাদ। টানা দুই যুগ ধরে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন।
অথচ বাশারের শুরুটা এমন ছিলো। বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে যখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে আর্বিভূত হন তখন বাশারকে ঘিরে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে ছিলো সিরিয়ার নাগরিকরাও। প্রেসি়ডেন্টেন পদে বসেই সিরিয়ার একাধিক সমস্যার সমাধান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাশার।
‘দামেস্ক বসন্ত’ নামে পরিচিত এক স্বল্প সময়ের কর্মসূচিতে বন্দি কয়েক ডজন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেন বাশার। এতে করে দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কিছুটা খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করেন। তখন সিরিয়ার নাগরিকেরা তাঁর শাসনে নতুন সম্ভাবনার আশা দেখেছিলেন।
শুধু কি তাই! বাবার আমলের বেশ কিছু সিদ্ধান্তও বদলে ফেলেন বাশার আল-আসাদ। এসব দেখে রাজনীতির ওঝারা বাশার আল-আসাদকে ‘সংস্কারবাদী’ নেতার তকমা দিয়েছিলেন। যদিও এক যুগের মধ্যে সেই তিনিই কিনা ধরা দেন কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসাবে। জোটে স্বৈরাচারী তকমাও জোটে।
পেশায় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ, লন্ডনে শিক্ষিত এবং প্রযুক্তি-প্রেমী বাশার প্রথম দিকে একজন আধুনিক এবং উদারপন্থী নেতা হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকলেও ধীরে ধীরে তিনিও হয়ে ওঠেন নৃশংস ও নিষ্ঠুর। ২০০১ সালে হাজারো সিরীয় বুদ্ধিজীবী গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি জানালে সরকারের গোপন পুলিশ দ্রুত তা দমন করে।
এরপরই বাশার তাঁর বাবার মতো দমনমূলক নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেন। অথচ এই বাশারের বাশারের রাজনীতিতে আসার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। ১৯৯২ সালে ডাক্তারি পড়তে লন্ডন যান। মন দিয়ে ফেলেন রক সঙ্গীতে। মনে ধরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। তবে বাশার আল-আসাদের জীবন তখন এক মোক্ষম মোড়ের সন্ধিক্ষণে। দামাস্কাসে গাড়ি দুর্ঘটনায় দাদার মৃত্যু বদলে দেয় সব কিছু।
তরুণ বাশারকে লন্ডন থেকে নিয়ে এসে ফেলে সিরিয়ায়। বাবার উত্তরসূরি হিসাবে তৈরি হতে শুরু করেন। যোগ দেন সেনায়। হাফিজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আসীন হন প্রেসিডেন্টের মতো প্রবল ক্ষমতার আসনে। মসনদে বসেই হাঁটেন সংস্কারের পথে।
প্রশাসনিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন বাশার। দীর্ঘ দিনের শাসনকালে বিভিন্ন সরকারি পদ এবং প্রতিষ্ঠানে নিজের পছন্দের লোকদের বসিয়েছিলেন হাফিজ। ক্ষমতায় এসেই সেই সব পদে পরিবর্তন করেন তাঁর পুত্র বাশার। নিয়োগ দিতে থাকেন প্রকৃত দাবিদার কর্মকর্তাদের।
শুধু তা-ই নয়, দেশের অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে করেছিলেন আর্থিক সংস্কারও। হাফিজের বহাল করা বেশ কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেছিলেন বাশার। শাসনকালের প্রথম দশক সিরিয়া দেখেছিল সুশাসককে। কিন্তু সেই আরব বসন্তের সূচনার পরই নিজেদের ভাবমূতি বদলে ফেলেন বাশার।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজের পছন্দের ও বিশ্বস্ত লোকদের নিয়োগ দিতে শুরু করেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সব পদে পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীতে রদবদল করেন। নিজের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বসিয়ে প্রশাসনের লাগাম টেনে ধরতে শুরু করেন।
হাফিজ আল-আসাদের উত্তরসূরি হওয়ার কথা ছিল না তাঁর ছোট ছেলে বাশার আল-আসাদের। প্রথা মেনে হাফিজের পর তাঁর বড় ছেলে বাসেল আল-আসাদ ক্ষমতার কেন্দ্রে আসবেন, এটাই ভেবেছিলেন অনেকে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় বাসেলের মৃত্যু হয়। এতে সিরিয়ার রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়।
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দৃশ্যপটে আসেন বাশার আল-আসাদ। তখন বাশার যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চক্ষুবিজ্ঞানে উচ্চতর পড়াশোনা করছিলেন। বাবার নির্দেশে দেশে ফেরেন। এরপর সিরিয়ায় সামরিক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। রাজনৈতিক বিষয়ে হাতে-কলমে জ্ঞানার্জন করতে থাকেন।
বাশারকে তাঁর বাবাই একজন শাসক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। ২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি দেশের শাসনভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। ২০০৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাশার পুনর্নির্বাচিত হন। শাসনামলের শুরুর দিকে বাশার সংস্কারের ভূমিকা রাখেন।
প্রেসিডেন্ট হয়েও শুরুর দিকে আসাদকে সাধারণ জীবন কাটাতে দেখা যেত। গাড়ি চালাতেন নিজেই। ব্রিটিশ-সিরীয় স্ত্রী আসমাকে সঙ্গে নিয়ে রেস্তোরাঁয় নৈশভোজে যেতেন। ওই সময় তরুণ, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ও আধুনিক মানসিকতার বাশার সিরীয়দের কাছে পছন্দের মানুষ ছিলেন।
তবে পরিস্থিতি ক্রমেই বদলে যায়। সংস্কারকের ভূমিকা থেকে আসাদ কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে উঠতে শুরু করেন। বিরোধী মত দমনে তাঁর কুখ্যাতি ছড়াতে থাকে। সিরিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় অনেক সরকারবিরোধী শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীকে। তিনি বলেন, পশ্চিমা গণতন্ত্র সিরিয়ার জন্য নয়।
আসাদ তাঁর বাবার মতো শক্তি প্রদর্শন করতে থাকেন। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সহিংস সামরিক অভিযান চালানো হয়। সিরিয়ার সেনাবাহিনী, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া এবং রাশিয়ার সহায়তায় আসাদ সরকার বিরোধীদের দমন করার জন্য ব্যাপক বোমা হামলা এবং বিধিনিষেধ ব্যবহার করে।
বাশার ক্ষমতা নেওয়ার আগে থেকেই সিরিয়ার তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও বাক্স্বাধীনতার অভাববোধ থেকে তুমুল হতাশা ছিল, যা উসকে দেয় আরব বসন্ত। ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ার দক্ষিণের শহর দেরাতে প্রথম সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়।
তবে এর আগে দেশটির বিভিন্ন স্থানে ছোট ও বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হয়েছিল। বিক্ষোভ দমাতে সরকারি বাহিনীকে মাঠে নামান বাশার। দমন–পীড়নের মুখে বিক্ষোভকারীরা বাশারের পদত্যাগের দাবি তোলেন। এতে বেড়ে যায় দমন–পীড়ন। সেই সঙ্গে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো সিরিয়ায়।
এক সময় বাশারবিরোধীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেন। বাশারও শুরু করেন চরম দমন–পীড়ন। তবে খুব একটা লাভ হয়নি। সিরিয়াজুড়ে শতাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী বাশারের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। একের পর এক এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দেশটিতে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
গৃহযুদ্ধের কারণে ৫ লাখের বেশি মানুষ নিহত হন এবং এক কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। দেশটির পূর্ববর্তী ২ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকই এখন শরণার্থী, যাদের অনেকেই জর্ডান, তুরস্ক, লেবানন এবং ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছেন।
এক সময়ের সমৃদ্ধ সিরিয়া এখন রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ২০১১ সালে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এখনও থামেনি। এরই মধ্যে ইতিহাসের ভয়াবহতম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে সিরিয়া। গাজা, লেবানন আর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ববাসী যখন সরব, তখন নতুন করে আলোচনায় সিরিয়া।
বিদ্রোহী যোদ্ধাদের কাছে দামেস্কের পতনের পর আসাদ পালিয়ে গেছেন। তিনি এখন কোথায় কেউ জানে না। ধারণা করা হচ্ছে, রাজধানী দামেস্ক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। আসাদের পতনের মাধ্যমে তাঁর পরিবারের প্রায় ৫৪ বছরের শাসনের ইতি ঘটে।