তালেবানের চোখে সানগ্লাস, পায়ে স্নিকার্স, মুখে আইসক্রিম

সফটওয়্যার- কম্পিউটারের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সব ধরনের সফটওয়্যারে নিত্য পরিবর্তন হতে থাকে। বের হতে থাকে নতুন নতুন সংস্করণ। ঠিক তেমনই কি হতে চলেছে কাবুলের মসনদে আবারো ফিরে আসা তালেবানরা।

বলা হচ্ছে, এখনকার তালেবান আর আগের তালেবান এক নয়। এবারের তালেবান বদলে যাওয়া তালেবান। নতুন সংস্করণের তালেবান, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘তালেবান ২.০’। কারণ, এরি মধ্যে তালেবানের নতুন চেহারা দেখতে শুরু করেছে বিশ্ব।

আফগানিস্তান দখল করে নেয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তালেবান গোটা বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে, তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। বলেছে এবার বদলে যাওয়া তালেবানকে দেখতে পাবে বিশ্ব। যেখানে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। নারী ও সংখ্যা লঘুদের অধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহাবস্থান নিশ্চিত করার ঘোষণাও দিয়েছে তালেবান। নিজেদের ভূমিকে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার হতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তালেবান। তবে তাদের কথার চেয়ে কাজের দিকেই তাকিয়ে বিশ্ব।


তালেবান বলেছে, ইসলামি শরিয়ত আইন মেনে নারীরা সমাজের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে। কোন কিছুতেই বাধা দেওয়া হবে না। আর আফগানিস্তানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদেই থাকবে বলে জানিয়েছে তালেবান নেতারা।

তালেবান শাসনের দ্বিতীয় পবে উপরের সব প্রতিশ্রুতি কতটা মুখে, কতটা কাজে, সেটি সময়ই সব পরিস্কার করে দেবে। তবে এরি মধ্যে বেশকিছু দৃশ্যপট সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে বদলে যাওয়া তালেবানের আভাস পাওয়া গেছে।

আফগানিস্তানে ১৯৯৪ সালের গৃহযুদ্ধের সময় বিবাদমান অনেক সংগঠনের একটি ছিলো তালেবান। সেই সময়ে তাদের আর্থিক সঙ্গতি ছিলো অনেকটাই কম। কিন্তু সময় বদলে গেছে। ২০২১ সালে এসে তালেবানের রয়েছে মোটা অংকের কোষাগার।

পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে বেড়ে ওঠা একটি অনভিজ্ঞ সংগঠনের বিপরীতে তালেবান এখন শক্তিশালী ভীতের ওপর দাঁড়িয়েছে। আয়ের বিভিন্ন উৎস নিশ্চিত করে একটি স্বাস্থ্যবান তহবিল গড়ে তুলেছে তালেবান।

ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর টেলিভিশনের একপ্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালে কাবুল থেকে উৎখাত হবার পরও হাল ছেড়ে না দিয়ে দেশজুড়ে বিদ্রোহ বজায় রেখেছে তালেবান। এতে করে তারা বিভিন্ন শক্তির সমর্থন পেয়েছে, পেয়েছে নগদ সহায়তার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকাগুলোতে ব্যাপক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা গড়ে তোলে তালেবান। দুর্গম খনন কাজের দখল নেতারা। সেই সঙ্গে মাদক চোরালাচান ও অস্ত্র বাণিজ্য তো ছিলোই। এসব থেকেই লাখ লাখ ডলার আয় করে তালেবান।

দীর্ঘ ২০ বছরে তালেবান শুধু অর্থশালী হয়নি, সেই সঙ্গে নারীর প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গীতে পরিবর্তন এসেছে। কাবুল পতনের দুই দিন পর, আফগান টিভিতে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেলো, যা সাবেক তালেবান শাসনামলে অকল্পনীয় ছিলো।


টলো নিউজ চ্যানেলের একজন আফগান মহিলা উপস্থাপক একজন তালেবান কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। উপস্থাপক বেহেশতা আরগন্ধ আফগান রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। এছাড়া, বেসরকারি মালিকানাধীন এই নিউজ চ্যানেল কাবুলের রাস্তা থেকে রিপোর্ট করা আরেক নারী সাংবাদিকের একটি ভিডিও পোস্ট করেছে।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল, তালেবানি শাসনকালের প্রথম পর্বে নারী শিক্ষায় ছাড় দেওয়া হয়েছিল প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত। সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো টিভি দেখা বা গান শোনা। সেই বিবেচনায় টিভি পর্দায় নারী মুখ, রাস্তা থেকে রিপোর্টিং ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রথম জামানায় তালেবন বিশ্বশক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলো। সেই ভুল আর করতে চায় না তারা। জঙ্গি গোষ্ঠিটি ভালো করেই জানে, বিশ্ব শক্তিকে অবহেলা করে নিজেদের ভূমিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের স্বর্গভূমি বানানোর মানেই হচ্ছে, বিদেশি সামরিক শক্তিকে আহবান করা।

আমেরিকার মাটিতে নাইট ইলিভেনের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার নাটের গুরু আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তালেবানের পরিণতির কথা এখনও গোষ্ঠিটির মনে আছে। সেই ভুল আর করতে চায় না তারা।

মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও,নতুন তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরতে চাইছে। এজন্য সামাজিক মাধ্যমে জোর দিতে চাইছে তালেবান। তাই তুলে ধরছে বদলে যাওয়া তালেবানের ছব নিজেদের জঙ্গি তকমা মুখে ফেলে সাধারণ আফগান হিসাবে তুলে ধরতে ব্যস্ত তালেবান যোদ্ধা ও কর্মীরা। আইসক্রিম খাওয়া বা জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করার ভিডিও সুপরিকল্পিত ভাবেই প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বলতে চাইছে আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত হতে প্রস্তুত তারা।

এখানেই শেষ নয়। তালেবদের দাড়ি কামানো নিষিদ্ধ হলেও, সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবিতে দেখা গেছে দাড়ি-কামিয়ে সানগ্লাস পরে নতুন লুকে কাবুলের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা।

সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ্যে এনেছে তালেবান। যেখানে তাদের হাজারা ও শিখ সম্প্রদায়ের বাড়িতে যেতে দেখা গেছে। অভয় দিয়েছে তাদের। সেই সঙ্গে হেরাতে স্কুলে মেয়েদের অংশ নেয়ার ছবিও প্রচার করেছে তালেবান।

নতুন তালেবান পূর্বসূরীদের কঠোর চেহারা পরিত্যাগ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথম আমলে তাদের যোদ্ধারা পরিচিতি ছিলো দুরন্ত ও মারাত্মক চেহারার জন্য। গায়ে থাকতো তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক আরমুখ ভর্তি দাড়ি। সেখানে এখনকার যোদ্ধারা সানগ্লাস, স্নিকার্স, হেডবেন্ড থেকে শুরুকরে পশ্চিমা কোটও পরিধান করতে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু, এতো কিছু করেও কি শেষ রক্ষা হবে, এমন প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। পাশাপশি আফগান সমাজকর্মীরও চিন্তিত। সবার একটাই শঙ্কা, মুখে যতই বদলে যাওয়া বলুন না কেন, সেই পুরনো বর্বর আর অসভ্য রূপেই ফিরবে তালেবান!

একাত্তর/ এনএ