নেপালে দুর্নীতির সংস্কৃতির অবসান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে সরকারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডু। হাজার হাজার তরুণ শহরটির রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করছেন। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানে আছে দেশটির পুলিশ। এরিই মধ্যে পুলিশের গুলিতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৬ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত নয়া বানেশ্বরে জেন-জিদের প্রতিবাদ কর্মসূচির সময় পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছে। চিকিৎসক দীপেন্দ্র পাণ্ডে নিশ্চিত করেছেন যে, জাতীয় ট্রমা সেন্টারে আনা ৭ জন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন। আরও ১০ জনের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া, অন্যান্য আঘাতে আহত আরও ২০ জনের বেশি ব্যক্তি চিকিৎসাধীন।
সরকার ২৬টি অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্ম ব্লক করার পর শুক্রবার থেকে ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ বেশ কয়েকটি সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ব্যবহার করা যাচ্ছে না। যার ফলে নেপালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত হয়েছেন। ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমে নেপালে লাখ লাখ ব্যবহারকারী রয়েছেন- যারা বিনোদন, সংবাদ ও ব্যবসার জন্য এই মাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভর করে থাকে।
সোমবার সকালে রাজধানী কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকায় প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমন করতে রাজধানী কাঠমান্ডুতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে সরকার। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত হচ্ছে বিক্ষোভকারীদের। বিক্ষোভের নেতৃত্বে রয়েছে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম। তাদের সমর্থন জানিয়েছেন দেশটির খ্যাতনামা শিল্পী ও বিনোদন জগতের তারকারা। নিজেদের ফেসবুক পোস্টে প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন তারা।
পুলিশ প্রতিবাদকারীদের ওপর জলকামান, টিয়ার গ্যাস এবং তাজা গুলি ব্যবহার করেছে। রাজধানী কাঠমান্ডু এবং অন্যান্য বড় শহরে এখনও প্রতিবাদ চলছে। বিক্ষোভকারীরা নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে প্রবেশ করার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও গুলি চালায়। এতে অনেকে আহত হন। দুর্নীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে জেনারেশন জেডের তরুণেরা রাস্তায় নামলে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
এখন পর্যন্ত রাজধানী কাঠমান্ডুতেই সীমাবদ্ধ আছে বিক্ষোভ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঠমান্ডু জেলা প্রশাসন দপ্তর থেকে ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেই নোটিশে বলা হয়েছে সোমবার স্থানীয় সময় বেলা ১২ টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জারি থাকবে কারফিউ। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ অমান্য করে সড়কে নেমেছেন বিক্ষুব্ধ জনতা।
নেপালের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন শীতল নিবাস, ভাইস প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন, রাজপরিবারের প্রধান প্রাসাদ সিংহ দরবার, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসবভন ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট।
প্রথমে বানেশ্বরের কিছু এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছিল। কারণ, বিক্ষোভকারীরা সেখানে একটি নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তবে নতুন সিদ্ধান্তে কারফিউয়ের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন এটি রাষ্ট্রপতির বাসভবন শীতল নিবাস এলাকা, মহারাজগঞ্জ, ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবন, সিংহ দরবারের চারপাশ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বলুয়াতার ও এর আশপাশের এলাকা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
নেপালে সরকারের দুর্নীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিসরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে কিছুদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিল দেশটির তরুণ সমাজ। তারা কিছুদিন ধরে ডিজিটাল পরিসরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। তবে সোমবার সকালে ডিজিটাল পরিসর পেরিয়ে এবার রাস্তায় নেমেছে জেনারেশন জেড।সকাল ৯টা থেকে রাজধানী কাঠমান্ডুর মৈতিঘরে জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান তোলেন তরুণেরা।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ‘নেপো কিড’ ও ‘নেপো বেবিজ’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করছিল। সরকার অনিবন্ধিত প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই হ্যাশট্যাগ আন্দোলন আরও বেশি গতি পায়। ‘হামি নেপাল’ সংগঠন এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। তারা এর আগে প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতিও নেয়। সংগঠনের চেয়ারম্যান সুধান গুরুঙ বলেন, সরকারের পদক্ষেপ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে আরও নানা জায়গায় এ ধরনের কর্মসূচি চলছে।