সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং সরকারের সীমাহীন দুর্নীর্তির বিরুদ্ধে নেপালের তরুণ প্রজন্মের তীব্র বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে ঘিরে উত্তাল রয়েছে দেশটির রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর। এরিই মধ্যে কাঠমান্ডুতে জারি করা হয়েছে কারফিউ; মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের নির্বিচারে গুলিতে এখন পর্যন্ত ১৬ জন নিহত ও বহু আহতের খবর পাওয়া গেছে।
গেলো কিছুদিন ধরেই নেপালের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। দেশটির সরকার সামাজিক মাধ্যমের ওপর চড়াও হবার পর থেকেই এর সূচনা হয়। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন প্লাটফর্মে হ্যাশট্যাগ আন্দোলন শুরু করেন তারা। দ্রুততম সময়ে তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে যোগ হয় সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ।
গত বৃহস্পতিবার নেপালের যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা আসে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা হচ্ছে, কারণ তারা সরকারের কাছে নিবন্ধিত হয়নি। সরকার ২৮ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিলও, যাতে প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশন করে।
তবে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ), আলফাবেট (ইউটিউব), এক্স, রেডিট, ও লিংকডইনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো আবেদন না করায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যদিও টিকটক, ভাইবার, উইটক, নিমবাজ ও পোপো লাইভ এরই মধ্যে নেপাল সরকারের কাছে নিবন্ধিত, তাই তারা এখনো সচল রয়েছে। টেলিগ্রাম ও গ্লোবাল ডায়েরি’র আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সরকারের মতে, এই প্ল্যাটফর্মগুলিতে ভুয়া আইডি ব্যবহারকারীরা দূষিত কাজ এবং সাইবার অপরাধ করছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ব্যাহত করছে। ২০২১ সালের এনটিএ রিপোর্ট অনুসারে, নেপালের ৩ কোটি মানুষের প্রায় ৯০ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, নেপালের জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫ শতাংশ বিদেশে বসবাস করত, যারা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগের জন্য মেটার মেসেঞ্জারের মতো প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভর করত। অনেক নেপালি তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের জন্য ভাইবার ব্যবহার করেছে যারা বিদেশে অভিবাসী কর্মী হিসেবে কাজ করছে।
কাঠমান্ডু পোস্ট জানাচ্ছে, দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ফেসবুক এবং ৩৬ লাখ ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী রয়েছেন। অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে দেশটির তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ তাদের আয়ের জন্য ইনিস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। আর ফেসবুকজুড়ে ছিলো বহু অনলাইন ব্যবসা। ফলে, নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের জীবনে।
সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও, বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এটি এখন আর শুধু একটি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; এটি পরিণত হয়েছে দেশ জুড়ে দুর্নীতিবিরোধী এক গণআন্দোলনে। তরুণ প্রজন্মের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন দেশটির বিনোদন ও সংস্কৃতি জগতের তারকারা। তার তাদের সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের সঙ্গী সামিল হচ্ছেন।
২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউজন রাজভান্ডারি বলেন, এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছে সামাজি কমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে। তবে এখান শুধু সেটার বিরোধিতা করছি না। আমরা রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইক্ষমা তুমরোক বলেন, আমরা সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলনে নেমেছি। পরিবর্তন চাই।
কাঠমান্ডুর ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউজান রাজভাণ্ডারি ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থেকে আমাদের আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। আমরা নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছি।’’
ইক্ষামা তুমরোক নামের ২০ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘আমরা সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি। আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। অন্যরা সরকারের এমন আচরণ মেনে নিয়েছে। কিন্তু এটি আমাদের প্রজন্মের মাধ্যমে শেষ হওয়া উচিত।’’
রোববার দেশটির সরকারি এক বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান করে এবং এ ধরনের স্বাধীনতার সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর আগে দেশটির সরকার অনলাইন প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের কাজে ব্যবহারের অভিযোগে টেলিগ্রাম নিষিদ্ধ করে। গত বছর নেপাল সরকার টিকটক নিষিদ্ধ করেছিল। তবে আগস্টে টিকটক নেপালের আইন মানতে সম্মত হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।