‘নতুন নেপাল’ গঠনে সংস্কার ও পরিবর্তনের ডাক দিলো জেন-জি

কলম্বো থেকে ঢাকা হয়ে কাঠমান্ডু! তিন শহরের তিন বছরের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের শক্তি দেখলো। তিন দেশেই জনগণের ওপর চেপে বসে থাকা রাজনৈতিক স্বৈরাচারকে শাসন থেকে বিতাড়িত করেছে তরুণ প্রজন্ম, যাদের সংক্ষেপে বলা হয় জেন-জি। তাদের সবশেষ সফলতা বীজ বপণ হলো কাঠমান্ডুতে। 

জেন-জি তরুণদের অভূতপূর্ব গণআন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন সরকারকে পতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। টানা বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও তীব্র রাজনৈতিক চাপের পর ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কয়েক ঘন্টা পর তাকে অনুসরণ করেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌডেল।

এতেও থেমে থাকেনি জেন-জি। সংসদ ভবন, ওলিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে মঙ্গলবার রাতেই নেপালের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগডেল।

তরুণদের আন্দোলন কেবলমাত্র সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশেই থেমে নেই; বরং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেপালের তরুণ প্রজন্ম একগুচ্ছ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবি সামনে এনেছে। দাবি করেছেন, যেসব মানুষ এই বিক্ষোভ যারা হারিয়েছে, তাদের সবাইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। 

সেই সঙ্গে শহীদদেন পরিবারকে সরকারি সম্মান, স্বীকৃতি এবং আর্থিক সহায়তা দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আন্দোলনের সংগঠকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নেপালে বেকারত্ব মোকাবিলা, অভিবাসন হ্রাস এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে। 

প্রতিবাদী তরুণরা বুধবার দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই আন্দোলন কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের জন্য নয়। এটি গোটা প্রজন্মের জন্য, দেশের ভবিষ্যতের জন্য। শান্তি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেটি শুধু নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তর উপর ভিত্তি করেই সম্ভব এবং ঘুনে ধরা ব্যবস্থাকে চিরবিদায় জানাতে হবে।

নেপালের জেন-জি যেসব দাবিকে সামনে এনেছে, এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো- দ্রুত বর্তমান প্রতিনিধিসভা বিলুপ্ত করতে হবে, কারণ জনগণের আস্থা সেটি হারিয়েছে। নাগরিক, বিশেষজ্ঞ ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সংবিধান সংশোধন বা সম্পূর্ণ নতুনভাবে রচনা করতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সময় শেষে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও প্রত্যক্ষ জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নির্বাহী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত তিন দশকে রাজনীতিবিদদের লুট করা সম্পদের তদন্ত করতে হবে এবং অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্ত করা হবে। পাঁচটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ খাতে কাঠামোগত সংস্কার ও পুনর্গঠন করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ওলি পদত্যাগ করেন যখন কয়েকশত বিক্ষোভকারী তার দপ্তরে প্রবেশ করে। তারা অন্তত ২২ জন নিহতের দায় স্বীকার ও জবাবদিহি দাবি করছিলো। নিহতদের সবাই ছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরোপিত স্বল্পস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী তরুণ।

নেপালে এই তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে। নতুন প্রজন্ম স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে  তারা আর দুর্নীতি, অকার্যকর নেতৃত্ব ও সামাজিক অবিচার মেনে নেবে না। নতুন নেপাল বিনির্মাণে পরিবর্তন এখন তাদের অপরিহার্য দাবি।