মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিকল্পনার ভিত্তিতে গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় হামাস। তবে এখনও তাদের কিছু দাবি রয়েছে। একটি বিবৃতিতে হামাসের ইঙ্গিত- মিশরে ইসরাইলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা কঠিন এবং দীর্ঘ হতে পারে।
মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) ইসরাইলে হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এক বিবৃতিতে হামাস এসব তথ্য জানিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স। এদিকে ২০২৩ সালের এই দিনে ইসরাইলে হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, যা এখনও অব্যাহত। এদিনও গাজায় জল, স্থল ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কোনো যুদ্ধবিরতি না থাকায় ইসরাইল তার আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
সোমবার থেকে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে ইসরাইল গাজা থেকে প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার আলোচনাকে এই যুদ্ধ শেষ করার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছে এবং গাজা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের সাত অক্টোবরে ইসরাইলে হামলায় ১২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
অপরদিকে, হামাসের হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে হামাস, ইসলামিক জিহাদ ও অন্য ছোট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, ‘সব উপায়ে প্রতিরোধের পথই শত্রুর মোকাবিলার একমাত্র উপায়।’ তারা আরও বলেছে, ‘কারও অধিকার নেই প্যালেস্টাইনি জনগণের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার। এই বৈধ অস্ত্র প্যালেস্টাইনি প্রজন্মের হাতে হাতে পৌঁছাবে যতক্ষণ না তাদের ভূমি ও পবিত্র স্থান মুক্ত হয়।’
ইসরাইলিরা এই হামলার বার্ষিকীতে নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল এবং তেল আবিবের হোস্টেজ স্কয়ারে সমবেত হয়েছে। এই দিনটি হলোকাস্টের পর ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন হিসেবে বিবেচিত।
ইসরাইলের বাসিন্দা হিল্ডা ওয়েইসথাল বলেন, জিম্মিরা এখনও ফিরে আসেনি, এটা যেন একটা খোলা ক্ষত। আমি আশা করি সব নেতারা চেষ্টা করবেন এবং এই যুদ্ধ শেষ হবে।
গাজার মোহাম্মদ দিব যুদ্ধ শেষের আশা প্রকাশ করে বলেন, দুই বছর ধরে আমরা ভয়, আতঙ্ক, উচ্ছেদ ও ধ্বংসের মধ্যে বসবাস করছি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৬৭ হাজারের বেশি প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ১৮ বছরের কম বয়সী। এই তথ্যে বেসামরিক ও জঙ্গিদের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। ইসরাইল বলেছে, অন্তত ২০ হাজার জঙ্গি ছিলো।
ইসরাইল বলেছে, তাদের আক্রমণ হামাসের বিরুদ্ধে এবং তারা বেসামরিক হত্যা এড়াতে চেষ্টা করে, কিন্তু হামাস জনগণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যা হামাস অস্বীকার করে।
জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন গত মাসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে, যা ইসরাইল ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ও ‘কলঙ্কজনক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০২৩-এর হামলার জবাবে ইসরাইল গাজায় আক্রমণ শুরু করে, হামাসের নেতাদের হত্যা করে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালায়। এটি ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা করে এবং ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেয়।
গাজার এই আক্রমণে অঞ্চলটি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং ইসরায়েল বিশ্ব মঞ্চে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিছু পশ্চিমা নেতা প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে প্যালেস্টাইনপন্থী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরাইল ও হামাস ট্রাম্পের পরিকল্পনার সামগ্রিক নীতিগুলো সমর্থন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিরতি, জিম্মি মুক্তি এবং গাজায় ত্রাণ সরবরাহ। এটি আরব ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন পেয়েছে। ট্রাম্প দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার আহবান জানিয়েছেন।
এমনকি মিশরে চুক্তি হলেও গাজার শাসন ও পুনর্গঠন নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেশিরভাগ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি ছিটমহল পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিলিয়ন ডলার কে দেবে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হামাসের যে কোনো ভূমিকাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের একটি স্পষ্ট সময়সীমা এবং যুদ্ধ শেষের নিশ্চয়তা চেয়েছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সোমবার শুরু হওয়া আলোচনার এই পর্বে কমপক্ষে কয়েক দিন সময় লাগবে।
যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনায় জড়িত একজন কর্মকর্তা এবং প্যালেস্টাইনি একটি সূত্র জানিয়েছেন, জিম্মিদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়ে আনার ট্রাম্পের সময়সীমা মৃত জিম্মিদের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্য হতে পারে, কারণ তাদের দেহাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্থান থেকে উদ্ধার করতে হবে।
ইসরাইলের প্রধান আলোচক, কৌশলগত বিষয়ক মন্ত্রী রন ডার্মার এই সপ্তাহের শেষে আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ইসরাইলি প্রতিনিধিদলে যোগ দেবেন বলে তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
হামাসের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের নির্বাসিত গাজা নেতা খলিল আল-হায়া, যিনি গত মাসে কাতারের রাজধানীতে ইসরাইলি বিমান হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ওই আলোচনায় যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে পাঠানো হয়েছে।