ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো আমেরিকাকে ‘মাদকের ছুতোয়’ তাদের দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ করেছেন। ইতিমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে উত্তেজনা। আমেরিকা এই অভিযানকে ‘ড্রাগ ট্রাফিকিংয়ের বিরুদ্ধে’ বলে দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা এতে রেজিম চেঞ্জের উদ্দেশ্য দেখছেন।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে মেডিটেরানিয়ান সাগর থেকে ক্যারিবিয়ানের দিকে রওনা হয়েছে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড—যা ৯০টি বিমান বহন করতে সক্ষম এবং এর সঙ্গে ধ্বংসকারী জাহাজ ও ক্রুজ মিসাইলের একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রুপ রয়েছে। এই জাহাজটি গত সপ্তাহে ক্রোয়েশিয়ার উপকূলে দেখা গিয়েছিলো।
এর আগে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আমেরিকা ১০টি বিমান হামলা চালিয়েছে সন্দেহজনক ড্রাগ বোটগুলোর উপর, যাতে মোট ৪৩ জন নিহত হয়েছে। সর্বশেষ হামলায় ট্রেন ডি আরাগুয়া গ্যাং-এর সঙ্গে যুক্ত একটি জাহাজে আঘাত করে ছয় জন ‘নারকো-টেররিস্ট’কে হত্যা করা হয়। এই গ্যাংকে আমেরিকা ‘টেররিস্ট সংগঠন’ ঘোষণা করেছে। হামলাগুলো ক্যারিবিয়ান সাগর, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং প্রশান্ত মহাসাগরে (২১-২২ অক্টোবর) সংঘটিত হয়েছে।
আমেরিকার এই অভিযানে আরও যুক্ত হয়েছে যুদ্ধজাহাজ, পারমাণবিক সাবমেরিন এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। সিএনএনের রিপোর্ট অনুসারে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার কোকেন উৎপাদন কেন্দ্র এবং ট্রাফিকিং রুটে হামলার বিষয়ে চিন্তা করছেন, যদিও এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্প বলেছেন, আমরা সমুদ্র নিয়ন্ত্রণে এসেছি, এখন স্থল অভিযানের দিকে তাকাচ্ছি।
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরো অভিযোগকে ‘যুদ্ধের ছলে’ অভিহিত করে বলেছেন, তারা (আমেরিকা) প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আর কোনো যুদ্ধে জড়াবে না। কিন্তু তারা একটি নতুন চিরকালীন যুদ্ধ তৈরি করছে। মাদুরো আমেরিকার ড্রাগ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং এটিকে তাদের সরকারকে অস্থিতিশীল করার কৌশল বলে দাবি করেছেন।
চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেছেন, এটি শুধু ড্রাগ যুদ্ধ নয়, এর পেছনে রেজিম চেঞ্জের উদ্দেশ্য রয়েছে। সামরিক জোট গঠনের লক্ষ্য মাদুরোর সেনাবাহিনী এবং অভ্যন্তরীণ চক্রের হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করা।
প্রাক্তন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ব্রায়ান ফিনুকান এটিকে ‘আর্টিকেল ওয়ান সঙ্কট’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের যুদ্ধক্ষমতা এড়িয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যদি লোকেরা আর ড্রাগ বোট ফাটাতে না চায়, তাহলে আমেরিকায় ড্রাগ পাঠানো বন্ধ করুন।
যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৫ জন ডেমোক্র্যাট সেনেটর এবং রিপাবলিকানের র্যান্ড পল এই হামলাগুলোর সাংবিধানিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া এগুলো চালানোর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট দেখা দিতে পারে। লাতিন আমেরিকায় এই অভিযানের বিরুদ্ধে নিন্দা বাড়ছে, কারণ সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে।
মাদুরোর মিত্র রাশিয়া ও ইরান এতে সাড়া দিতে পারে বলে ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। এই উত্তেজনা লাতিন আমেরিকার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার দিকে আমেরিকার এই নতুন পদক্ষেপ ড্রাগ যুদ্ধের ছদ্মবেশে রাজনৈতিক চাপের সঙ্কেত দিচ্ছে। কিন্তু এর ফলে কোনো বড় যুদ্ধের ঝুঁকি কম নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন এই সংকটের নিরীক্ষণ করছে।