গাজায় বন্দি ইসরাইলি জিম্মির যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

গাজায় ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকার সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ এনেছেন এক ইসরাইলি জিম্মি। ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর নোভা সংগীত উৎসব থেকে অপহৃত হওয়া রম ব্রাসলাভস্কি নামক ২১ বছর বয়সী এই তরুণ এক ইসরাইলি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশ্যে এই অভিযোগ করেছেন। পুরুষ জিম্মিদের মধ্যে তিনিই প্রথম প্রকাশ্যে এমন গুরুতর অভিযোগ আনলেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চ্যানেল ১৩-এর ‘হাজিনর’ অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া হয়েছে।

ব্রাসলাভস্কি তাঁর বন্দিদশার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাকে নগ্ন করে বেঁধে রাখা হতো। তিনি তার এক পাহারাদারের দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা স্মরণ করে বলেন, সেটি ছিল যৌন সহিংসতা এবং এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অপমান করা। তার লক্ষ্য ছিল আমাকে অপমান করা, আমার আত্মমর্যাদা চূর্ণ করা। অশ্রু সংবরণ করতে করতে তিনি জানান, সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা তার পক্ষে কঠিন।

সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, দয়া করে আমাকে বাঁচাও, আমাকে এখনই এখান থেকে বের করে দাও। 

জিহাদ গোষ্ঠীর অভিযোগ অস্বীকার

ব্রাসলাভস্কিকে মূলত ইসলামিক জিহাদ গোষ্ঠী বন্দি করে রেখেছিল, যারা হামাসের সহযোগী গোষ্ঠী এবং তারা ২০২১ সালের অক্টোবরের হামলায় জিম্মি নিয়েছিল। ইসলামিক জিহাদ ব্রাসলাভস্কির বন্দি থাকাকালীন তাঁর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলো, যেখানে তাকে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখা যায়।

ব্রাসলাভস্কির এই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসা করা হলে, ইসলামিক জিহাদের একজন কর্মকর্তা বিশদ বিবরণ ছাড়াই অভিযোগটিকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন।অন্যদিকে, ইসরাইলি সরকারের একজন মুখপাত্র দৈনিক অনলাইন ব্রিফিংয়ে ব্রাসলাভস্কির বক্তব্যকে গাজার গোষ্ঠীগুলোর আসল চরিত্রের জীবন্ত সাক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন।

পূর্বের অভিযোগ ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন

ইতোমধ্যে মুক্তি পাওয়া অন্তত চারজন নারী জিম্মি প্রকাশ্যে নিজেদের অথবা সহ-বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনার কথা জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি দল রিপোর্ট করেছে, তারা এমন পরিষ্কার এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেয়েছে যে, গাজায় নিয়ে যাওয়া কিছু জিম্মিকে যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে। তবে, জিম্মিদের বেশিরভাগকে ধরে রাখা হামাস গোষ্ঠী এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।

ব্রাসলাভস্কি নিয়মিত মারধরেরও বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যেন এটা বন্ধ হয়। আর আপনি যখন সেখানে থাকেন, প্রতিদিন, প্রতিটি প্রহারের সাথে, আপনি নিজেকে বলেন- আমি নরকে আরও একটি দিন পূর্ণ করলাম।

প্রেক্ষাপট ও পাল্টা অভিযোগ

২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত পেরিয়ে হামলায় ১,২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়। এর জবাবে ইসরাইল উপত্যকায় সামরিক হামলা শুরু করে, যাতে ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

ব্রাসলাভস্কি গত ১৩ অক্টোবর ইসরাইল এবং হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পাওয়া শেষ ২০ জন জীবিত জিম্মির মধ্যে একজন ছিলেন। এর বিনিময়ে প্রায় দুই ফিলিস্তিনি বন্দি ও গাজার আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে, ইসরাইলি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো সহ বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী যুদ্ধের সময় ইসরাইলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন, যার মধ্যে যৌন সহিংসতাও অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো নথিভুক্ত করেছে। ইসরাইল যদিও পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে যে, তারা সন্দেহভাজন কয়েক ডজন নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করছে।

ব্রাসলাভস্কির এই অভিযোগ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো দুই পক্ষের মধ্যে চলা সংঘাতের মানবিক ও নৈতিক দিকটিকে সামনে আনছে।