ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেলে বিক্রির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তেল বিক্রির সেই অর্থ মার্কিন অ্যাকাউন্টে জমা রাখার পরিকল্পনা করছে। জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এ তথ্য জানিয়েছেন, যা দরিদ্র এই দেশটির অপরিশোধিত তেল বাজারে আনা এবং এর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ওয়াশিংটনের কৌশলের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা।
বুধবার মিয়ামিতে গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপ ইনকর্পোরেটেডের এক সম্মেলনে রাইট বলেন, প্রাথমিকভাবে ভেনেজুয়েলার মজুত থাকা তেল বাজারে আনা হবে। মার্কিন অবরোধের কারণে দেশটির তেলের আধারগুলো পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
রাইট বলেন, আমরা শুধু সেই অপরিশোধিত তেল পুনরায় সচল করতে এবং বিক্রি করতে যাচ্ছি। আমরা ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেল বাজারজাত করব, প্রথমে এই জমে থাকা তেল এবং তারপরে অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদিত সব তেল আমরাই বিক্রি করব।
এই পরিকল্পনাটি এমন এক সময়ে এল যখন ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন জ্বালানি সংস্থাগুলোকে ভেনেজুয়েলার জরাজীর্ণ তেল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ঝিমিয়ে পড়া উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার জন্য চাপ দিচ্ছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর থেকে বেছে বেছে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা তার ৫ কোটি ব্যারেল তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে বিক্রির জন্য, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বাজারজাত করা শুরু করেছে।
এই বিক্রয়লব্ধ অর্থ মার্কিন ট্রেজারি অ্যাকাউন্টে রাখা হবে। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এর ফলে ভেনেজুয়েলার পাওনাদারদের হাত থেকে এই অর্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে। লেভিট বলেন, এই তহবিল আমেরিকান এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের উপকারে আসবে।
সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাইট বলেন, আমরা কারো তেল চুরি করছি না। আমরা বিশ্ব বাজারে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি পুনরায় শুরু করতে যাচ্ছি, সেই অর্থ ভেনেজুয়েলার নামে অ্যাকাউন্টে জমা রাখব এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে সেই অর্থ দেশটিতে ফেরত পাঠাব।
রাইট আরও স্পষ্ট করেছেন, তেল বিক্রির অর্থ প্রাথমিকভাবে এক্সন মবিল, কনোকোফিলিপস এবং অন্যান্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হবে না, যাদের সম্পদ ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মাদুরোর পূর্বসূরি হুগো শ্যাভেজ জাতীয়করণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ওই কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়া প্রয়োজন, তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিষয়।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পেট্রোলিওস ডি ভেনেজুয়েলা এসএ’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা তেল বিক্রির বিষয়ে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা করছে। এই কাঠামোটি শেভরনের সাথে তাদের বিদ্যমান চুক্তির মতোই হতে পারে। উল্লেখ্য, শেভরন একমাত্র মার্কিন কোম্পানি যারা এখনও দেশটিতে কাজ করছে।
এর আগে, মার্কিন বাহিনী নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী আরও দুটি তেলের ট্যাঙ্কার আটক করেছে, যার একটিতে রাশিয়ার পতাকা ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার সব তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করতে বদ্ধপরিকর। একটি ট্যাঙ্কার আইসল্যান্ডের দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে এবং অন্যটি ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আটক করা হয়েছে।
নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ট্রাম্প এখন শেভরন, কনোকোফিলিপস এবং এক্সনের মতো কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো সংস্কার ও উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন। একজন কর্মকর্তার মতে, প্রশাসন ইতিমধ্যেই একাধিক তেল কোম্পানির সাথে আলোচনা করেছে। লেভিট জানান, শুক্রবার জ্বালানি খাতের নির্বাহীদের সাথে প্রেসিডেন্টের বৈঠক করার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও এই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন।
বছরের পর বছর দুর্নীতি, বিনিয়োগের অভাব এবং অবহেলার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর উৎপাদন বর্তমানে দিনে ১০ লাখ ব্যারেলেরও কম। রাইট ধারণা করছেন যে, স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদে উৎপাদন দৈনিক কয়েক লাখ ব্যারেল বাড়ানো সম্ভব।
তবে এই শিল্পকে তার পুরনো গৌরবে ফিরিয়ে আনা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি-র লাতিন আমেরিকান জ্বালানি নীতি বিষয়ক পরিচালক ফ্রান্সিসকো মোনাল্ডির মতে, আগামী এক দশকে এর জন্য প্রতি বছর আনুমানিক ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এ ধরনের বড় উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে খুব একটা মুখ খোলেনি। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেলের মজুত থাকলেও, কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের আগে দেশটিতে একটি স্থিতিশীল সরকার নিশ্চিত করতে চাইবে। এছাড়া ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও ওয়াশিংটন তাদের পাশে থাকবে কি না, সে বিষয়েও তারা নিশ্চিত হতে চায়।