ইরানজুড়ে নতুন করে সহিংসতা, বিক্ষোভ দমনে হার্ডলাইনে প্রশাসন

ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় চলমান বিক্ষোভ দমনে আবারও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দেশটির শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই অস্থিরতার জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছে এবং শাসনব্যবস্থা রক্ষায় সংকল্প ব্যক্ত করেছে। তবে, বিভিন্ন সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভ আরও প্রবল হয়েছে এবং দেশটিতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইরান স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তার জন্য প্রস্তুত! তিনি বেশ কিছু দিন ধরেই ইরানের চলমান বিক্ষোভের সমর্থনে বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন।

পুরো ইরান জুড়ে নতুন করে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, তবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিক্ষোভের প্রকৃত ভয়াবহতা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শনিবার রাতে অনলাইনে প্রকাশিত নতুন ভিডিওগুলোতে রাজধানী তেহরানসহ উত্তরের রাশত, উত্তর-পশ্চিমের তাবরিজ এবং দক্ষিণের শিরাজ ও কেরমান শহরে নতুন করে বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এই ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ইরানের শেষ শাহ-এর নির্বাসিত পুত্র, যিনি বর্তমানে বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি এই বিক্ষোভকে ধর্মীয় শাসকদের উৎখাত করার লক্ষ্যে এক গণবিদ্রোহে রূপ দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি মিউনিসিপ্যাল ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দাঙ্গাকারীরা। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শিরাজ, কোয়াম এবং হামাদান শহরে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য সম্প্রচার করেছে।

iran2

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ফুটেজে তেহরানে বিশাল জনসমাগম এবং রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। তেহরানের সাদাতাবাদ জেলার একটি রাতের বিক্ষোভের ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায় যে, জনতা ওই এলাকাটি দখল করে নিয়েছে। তিনি বলেন, জনতা আসছে। স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক, খামেনির মৃত্যু হোক।

গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মূলত আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে এটি শুরু হলেও দ্রুতই তা রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং বিক্ষোভকারীরা ধর্মীয় শাসনের অবসানের দাবি তোলে। কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে অভিযুক্ত করেছে।

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই পরিস্থিতিকে ‘ধৈর্যের খেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বিরোধী পক্ষ সরকার পতনের আগ পর্যন্ত চাপ বজায় রাখতে চায়, আর কর্তৃপক্ষ চাইছে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের সুযোগ না দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভে অন্তত ৫০ জন প্রতিবাদকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২,৩০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পশ্চিম ইরানের এক প্রত্যক্ষদর্শী ফোনে রয়টার্সকে জানিয়েছেন , সেখানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং তারা গুলি চালাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যক্তি নাম প্রকাশ করতে চাননি। এদিকে তেহরানের কাছে বাহারিস্তান শহর থেকে ১০০ জন সশস্ত্র দাঙ্গাকারীকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি।

iran1

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে গত দুই রাতে সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী ঘাঁটিতে হামলার অভিযোগ এনেছে। তারা বলেছে, নিরাপত্তা বজায় রাখা তাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা। নিয়মিত সেনাবাহিনীও জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত অবকাঠামো রক্ষার ঘোষণা দিয়েছে।

শহরের কেন্দ্রস্থল দখলের প্রস্তুতি

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে হাঁটু গেড়ে বসানো হবে। তিনি জনগণকে নিজ নিজ শহরের কেন্দ্রস্থল দখল করার আহ্বান জানান এবং বলেন যে তিনি শিগগিরই ইরানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উত্তর-পশ্চিম ইরানের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে প্রচুর সংখ্যক আহত বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন সরাসরি গুলিতে আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন পরে মারা যান।

ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি এখনই পাহলভির সাথে দেখা করতে আগ্রহী নন। তিনি সম্ভবত পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখে বিরোধী নেতাকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেবেন।

iran3

গত গ্রীষ্মে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলের সাথে মিলে হামলা চালানো ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার জন্য বাহিনী পাঠানোর পর থেকেই ইরানকে তাদের হস্তক্ষেপের তালিকায় রেখেছে। শুক্রবার তিনি ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেন, গুলি চালানো শুরু করবেন না, কারণ তাহলে আমরাও গুলি চালানো শুরু করব।

শুক্রবার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছেন এবং হুশিয়ারি দিয়েছেন, তেহরান বিদেশিদের ভাড়াটে সেনা হিসেবে কাজ করা লোকদের বরদাশত করবে না।