আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ইরান। দেশটির কট্টরপন্থীরা বর্তমান দৃশ্যমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব অভ্যুত্থান বা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায়ী জানাজাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভ ও বিভাজন প্রকাশ্য রূপ নেয়, যা দেশটির বর্তমান শাসন ব্যবস্থার ভেতরে থাকা ফাটলকে বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে।

খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া হাজার হাজার কালো পোশাকধারী শোকাতুর মানুষের একাংশ দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দিকে তাকিয়ে সরাসরি স্লোগান তোলে,ন আপসকারীর মৃত্যু হোক।
শুধু তাই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনার মূল কারিগর ও ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে পাথর ছুড়ে মারে বিক্ষুব্ধ জনতা। এর ফলে তিনি অনুষ্ঠানস্থল থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
কট্টরপন্থী ও চরমপন্থী দলগুলোর (যাদের ‘সুপার রেভল্যুশনারি’ বা অতি-বিপ্লবী বলা হয়) দাবি, খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হলেও তিনি এখন সম্পূর্ণ অদৃশ্য। প্রাণভয়ে কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি জনসমক্ষে আসছেন না।
এই সুযোগে ইরানের দৃশ্যমান শীর্ষ নেতৃত্ব- প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করে ওয়াশিংটনের সাথে দাসত্বমূলক চুক্তি সই করেছেন। কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান সামাজিক মাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের জনগণের জন্য সতর্কবার্তা: দেশে কি কোনো অভ্যুত্থান হতে চলেছে?

এই অভ্যন্তরীণ বিরোধের মাঝেই হরমুজ প্রণালীতে রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরসিজি) বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর আমেরিকার সাথে ইরানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি চলতি সপ্তাহে প্রায় ভেঙে পড়েছে। এর ফলে ওয়াশিংটন পাল্টা হামলা চালালে কট্টরপন্থীরা এই চুক্তি পুরোপুরি বাতিলের দাবি তোলে।
এমনকি মোহাম্মদ আলী বখশি নামের এক কট্টরপন্থী ধর্মীয় গায়ক প্রেসিডেন্টকে গলা কাটার হুমকি দিয়ে বলেন, মাননীয় প্রেসিডেন্ট, নেতার শর্ত পূরণ না হলে আপনার গলায় আমাদের ছুরি চলবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং চরমপন্থীদের আগ্রাসী মনোভাব রুখতে গালিবাফ ও পেজেশকিয়ানের জোট ইতিমধ্যেই এই উগ্র গোষ্ঠীটিকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চুক্তি রদ করার চেষ্টা ও তথ্য ফাঁসের অভিযোগে নাবাবিয়ানসহ বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী সংসদ সদস্যকে জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই কট্টরপন্থীরা দেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংখ্যায় কম হলেও ইরানের সংসদ, প্রশাসন এবং জাতীয় গণমাধ্যম-আইআরআইবি’তে এই চরমপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই গোষ্ঠীর অন্যতম শীর্ষ নেতা সাঈদ জলিলি ১৩ কোটিরও বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে তাদের পেছনে বড় জনসমর্থন রয়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিলেও, পর্যবেক্ষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মূল লক্ষ্যে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এখনো একতাবদ্ধ।
তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি এবং কট্টরপন্থীদের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে সেনা অপহরণের মতো উগ্র আহ্বানের কারণে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
