ব্রিকসের যৌথ নৌ-মহড়া থেকে কেন দূরে ভারত-ব্রাজিল?

দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে চীন, রাশিয়া এবং ইরানসহ ব্রিকস (BRICS) ব্লকের বেশ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রের অংশগ্রহণে যৌথ নৌ মহড়া শুরু হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এই মহড়াকে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।

শনিবার থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী ‘উইল ফর পিস ২০২৬’ শীর্ষক এই মহড়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনস্থল সাইমন’স টাউনে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে উদ্ধার অভিযান, সামুদ্রিক হামলা এবং প্রযুক্তিগত বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান তিক্ত সম্পর্কের মাঝেই এই মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন ব্রিকস জোটকে একটি অর্থনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখে। উল্লেখ্য, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে এই জোট গঠিত হলেও ভারত ও ব্রাজিল এই মহড়া থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নৌ মহড়ায় কারা অংশগ্রহণ করছে?

চীন ও ইরান এই মহড়ায় ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছে; রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাঠিয়েছে করভেট এবং দক্ষিণ আফ্রিকা একটি মাঝারি আকারের ফ্রিগেট মোতায়েন করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্রাজিল, মিশর, ইন্দোনেশিয়া এবং ইথিওপিয়া এই মহড়ায় পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জয়েন্ট টাস্কফোর্স কমান্ডার ক্যাপ্টেন এনডওয়াখুলু থমাস বলেন, এটি শুধু একটি সামরিক মহড়া নয়, বরং ব্রিকস দেশগুলোর একটি সদিচ্ছার প্রতিফলন। একে ‘ব্রিকস প্লাস’ অপারেশন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য শিপিং এবং সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সামরিক মহড়াটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার চরম মুহূর্তে এই মহড়াটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলা সংশ্লিষ্ট একটি রুশ তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করার মাত্র তিন দিন পর এই মহড়া শুরু হলো। 

এছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের ঘটনা এবং ট্রাম্পের ইরান ও অন্যান্য দেশের ওপর হুমকির মুখে এই মহড়া বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্রিকস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকস সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকা-বিরোধী’ নীতির অভিযোগ এনেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ব্রিকস সদস্যদের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অপরাধে ভারতের ওপরও তিনি কঠিন শুল্ক আরোপ করেছেন।

ভারত ও ব্রাজিল কেন অংশ নিচ্ছে না?

ব্রাজিল পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকলেও ভারত এই মহড়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হর্ষ পান্তের মতে, ভারতের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার একটি চেষ্টা। 

ভারত ব্রিকসকে কোনো সামরিক জোট হিসেবে দেখতে চায় না, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব। তাছাড়া ইউএই বনাম ইরান বা মিশর বনাম ইরানের মতো অভ্যন্তরীণ পার্থক্যের কারণেও ভারত এই ‘ওয়ারগেম’ বা সামরিক মহড়ায় জড়াতে আগ্রহী নয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ঝুঁকি

এই মহড়া আয়োজনের ফলে ওয়াশিংটনের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্কের আরও অবনতি হতে পারে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এছাড়া ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে) দক্ষিণ আফ্রিকার আনা ‘গণহত্যা’র মামলা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ কৃষকদের নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল আরও বাড়িয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স এই মহড়ার সমালোচনা করে বলেছে, এর মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।