দক্ষিণ স্পেনে রোববার রাতে একটি উচ্চগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালের পর এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা। সবশেষ খবন পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছিলো।
রাজধানী মাদ্রিদ থেকে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ডোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্যমতে, এতে ১২২ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৮ জন এখনও হাসপাতালে ভর্তি এবং ১২ জন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
ভয়াবহ সংঘর্ষের সেই মুহূর্তের বর্ণনা
মাদ্রিদগামী যে উচ্চগতির ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে অন্য একটি ট্রেনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, সেটির যাত্রী লুকাস মেরিয়াকো এই অভিজ্ঞতাকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম লা সেক্সতা নোটিসিয়াসকে তিনি বলেন, আমরা পাঁচ নম্বর বগিতে ছিলাম। হঠাৎ ট্রেনের নিচে লাইনে কিছু একটার আঘাতের শব্দ পাচ্ছিলাম, তবে তখন সেটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি।
মেরিয়াকো জানান, ধীরে ধীরে সেই শব্দ আরও জোরালো হতে থাকে। তিনি বলেন, আরেকটি ট্রেন যখন আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সব কিছু প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে শুরু করল। আমাদের পেছনের দিকে একটা বিশাল ধাক্কা অনুভূত হলো এবং মনে হচ্ছিল পুরো ট্রেনটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে।
তিনি আরও জানান, সংঘর্ষের অভিঘাতে ট্রেনের জানালার কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, মালপত্র এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ে এবং মানুষজন মেঝেতে আছড়ে পড়েন। প্রাণ বাঁচাতে তখন মানুষ জানালার কাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করেন।
আদামুজের রেড ক্রস কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন মাদ্রিদগামী আনা নামের এক তরুণী বলেন, ট্রেনটি একদিকে হেলে পড়ল... তারপর চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল আর শুধু মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম।
শরীরে ব্যান্ডেজ ও কম্বল জড়ানো অবস্থায় তিনি জানান, অন্য যাত্রীরা তাকে জানলা দিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় টেনে বের করেন। পরে অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা তার বোনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করে এবং অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, সেখানে অনেক মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় চোখের সামনে ছিল, যাদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা মারা যাবেন, কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না।
জটিল উদ্ধার অভিযান
স্প্যানিশ রেড ক্রসের জাতীয় জরুরি পরিচালক ইনিগো ভিলা জানান, দুর্ঘটনাস্থলটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় উদ্ধার কাজ ব্যাহত হয়। একটি মাত্র সরু রাস্তা থাকায় অ্যাম্বুলেন্সগুলোর যাতায়াতে চরম অসুবিধা হয়েছে।
সোমবার সকালে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুয়েন্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
রাষ্ট্রীয় রেল অপারেটর রেনফে জানিয়েছে, ইরিও এবং আলভিয়া দ্বারা পরিচালিত ট্রেন দুটিতে প্রায় ৪০০ যাত্রী ছিলেন। ইরিও ট্রেনটি মালাগা থেকে মাদ্রিদ যাচ্ছিল এবং দ্বিতীয় ট্রেনটি উয়েলভার দিকে যাচ্ছিল।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান
রেনফের প্রেসিডেন্ট আলভারো ফার্নান্দেজ হেরেদিয়া স্থানীয় রেডিও স্টেশন 'কাদেনা সের'-কে জানান, দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কথা বলা এখনও আগেভাগেই হয়ে যাবে, তবে এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘটেছে। তিনি যোগ করেন, মানুষের ভুলের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, মানবিক ত্রুটির বিষয়টি কার্যত অসম্ভব, কারণ কোনো ভুল হয়ে থাকলেও ট্রেনের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সংশোধন করে নিতো। এছাড়া দুর্ঘটনাটি বাঁকে নয়, রেললাইনের একদম সোজা একটি অংশে ঘটেছে।
হেরেদিয়া জানান, বিপরীত দিক থেকে আসা আলভিয়া ট্রেনটি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বেগে চলছিল। এটি লাইনচ্যুত হওয়া ইরিও ট্রেনের শেষ দুটি বগিতে অথবা রেললাইনে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের ওপর আছড়ে পড়ে। ইরিও ট্রেনটি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে চলছিল।
জানা গেছে, ট্রেনটির একটি চাকা খুলে গেছে যা এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। লাইনচ্যুত হওয়ার মাত্র ২০ সেকেন্ডের মধ্যে সংঘর্ষটি ঘটায় ইমার্জেন্সি ব্রেক চাপার সময় পাওয়া যায়নি। হেরেদিয়া কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা অবকাঠামোগত সমস্যাকেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঘটনার এত দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো- অত্যন্ত জটিল।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটিভিই জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনার ফলে সোমবার মাদ্রিদ ও দক্ষিণ আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী দুইশ’র বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
গত বছরই সংস্কার হয় রেলপথ
পরিবহন মন্ত্রী পুয়েন্তে জানান, ইরিও ট্রেনটি চার বছরেরও কম পুরনো এবং যে রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা গত মে মাসে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে সম্পূর্ণ সংস্কার করা হয়েছিল। ইরিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রেনটি সর্বশেষ ১৫ জানুয়ারি পরিদর্শন করা হয়েছিল। স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক ৩,৬২২ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা ইউরোপের বৃহত্তম এবং চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। ২০২৪ সালে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ মাদ্রিদ এবং আন্দালুসিয়ার মধ্যে এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন।
ইরিও হলো ইতালীয় রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে অপারেটর ফেরোভিয়ে ডেলো স্ট্যাটো, এয়ার নস্ট্রাম এবং স্প্যানিশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড গ্লোবালভিয়ার একটি যৌথ উদ্যোগ। এটি ২০২২ সালের নভেম্বরে কার্যক্রম শুরু করে। অন্যদিকে আলভিয়া ট্রেনটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা রেনফে দ্বারা পরিচালিত।
ইউরোপজুড়ে শোকের ছায়া
রোববার সন্ধ্যা থেকে হাই-স্পিড ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতদের প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোক ও সমবেদনা জানানো হচ্ছে। স্পেনের জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বার্তায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স আপনাদের পাশে আছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রীও একই সুর মিলিয়ে বলেন, এই শোকাবহ ট্র্যাজেডিতে ইতালি স্পেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা স্পেনের জনগণকে শক্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন তাদের এই ব্যথা ও শোকের অংশীদার।