ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দীর্ঘ ২০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল। দিল্লির বুকে দুই পরাশক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো এক 'ঐতিহাসিক' বাণিজ্য চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশন প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন একে ‘সব চুক্তির জননী’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একে ভারতের কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখছেন। চুক্তি সইয়ের পর উভয়পক্ষই নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে ভুল করেনি।
এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত এবং ২৭টি ইউরোপীয় দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইইউ-এর মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠবে। এই দুই পক্ষ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ২০০ কোটি মানুষের বিশাল এক বাজারের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই বাণিজ্য চুক্তির আওতায় গাড়ির ওপর আমদানি শুল্ক বর্তমানে ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হবে (বার্ষিক ২.৫০ লক্ষ গাড়ি কোটায়)। রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং মহাকাশ প্রযুক্তির ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে বাতিল হবে।
ইউরোপীয় দুগ্ধ এবং চিনি শিল্পকে এই চুক্তি থেকে বাদ রাখা হয়েছে ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায়। ২০২৪-২৫ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা এই চুক্তির ফলে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
চুক্তিটি এমন এক সময়ে সই হলো যখন ভারত এবং ইউরোপ- উভয় পক্ষই ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক চাপের মুখে রয়েছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যার আলোচনা এখনও ঝুলে আছে।
গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে বিরোধের জেরে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধেও বাণিজ্যিক যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে ইইউ এবং ভারত নাম না নিয়ে ওয়াশিংটনকে এই বার্তাই দিল যে, তারা রক্ষণশীল শুল্ক ব্যবস্থার চেয়ে মুক্ত বাণিজ্যে বেশি বিশ্বাসী।
প্রতিরক্ষা ও জলবায়ু সহযোগিতা: শুধু বাণিজ্য নয়, দুই পক্ষ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কাজা ক্যালাস সমুদ্রসীমা নিরাপত্তা এবং সাইবার হুমকির মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ভারত ও ইইউ এখন একটি বিশ্বস্ত প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেম তৈরিতে সাপ্লাই চেইন একীভূত করার পরিকল্পনা করছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান: ২০০৭ সালে এই আলোচনার সূত্রপাত হলেও ২০১৩ সালে তা থমকে গিয়েছিল। ২০২২ সালের জুলাই মাসে আলোচনা পুনরায় শুরু হয় এবং শেষ কয়েক দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর এটি চূড়ান্ত রূপ পায়। এটি গত সাত মাসে যুক্তরাজ্যের পর ভারতের আরেকটি বড় বৈশ্বিক সাফল্য।
দিল্লিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইইউ নেতারা। সেই বন্ধুত্বের রেশ ধরেই এই চুক্তি ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সার্ভিস সেক্টরে এক নতুন জোয়ার আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং কাউন্সিলের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে।