নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ধ্রুবতারা জেসি জ্যাকসন আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা, বাগ্মী ধর্মযাজক এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জেসি জ্যাকসন মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। মঙ্গলবার তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে পারকিনসন রোগে ভোগার পর এই মহান নেতার জীবনাবসান হলো।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমাদের বাবা শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত, কণ্ঠহীন এবং অবহেলিত মানুষের জন্য একজন সেবক নেতা ছিলেন।

ছবি: রয়টার্স
১৯৪১ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রিনভিলে জন্মগ্রহণ করেন জেসি জ্যাকসন। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল বর্ণবাদী ‘জিম ক্রো’ আইনের আমলের ভয়াবহ বৈষম্যের মধ্যে। ছাত্রাবস্থায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়।

একবার শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত একটি গণগ্রন্থাগারে প্রবেশের কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন। তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮ সালে কিং যখন আততায়ীর গুলিতে নিহত হন, তখন জ্যাকসন তাঁর সঙ্গেই ছিলেন।

ছবি: রয়টার্স
জেসি জ্যাকসন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে নিজের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি ১৯৮৪ এবং ১৯৮৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের জন্য লড়াই করেন। ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে তিনি ৩.৩ মিলিয়ন ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। তবে ইহুদি বিদ্বেষী কিছু মন্তব্যের কারণে সে সময় তাঁর প্রচারণা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল।

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন এবং প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন ভোট (২৯%) পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ‘রেইনবো কোয়ালিশন’ কৃষ্ণাঙ্গদের পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ উদারপন্থীদেরও এক কাতারে নিয়ে এসেছিল।

ছবি; রয়টার্স
যদিও তিনি কখনো নির্বাচিত কোনো পদে আসীন হননি, তবে তাঁর পথ ধরেই পরবর্তীতে বারাক ওবামা আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুপ্রেরণা পান।

জ্যাকসন শুধু রাজপথের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী। বিভিন্ন দেশে বন্দি থাকা আমেরিকানদের মুক্ত করতে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে সিরিয়া থেকে নৌ-সেনা রবার্ট গুডম্যানকে মুক্ত করেন।

ছবি: রয়টার্স
১৯৯০ সালে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে দেখা করে কয়েকশ বন্দিকে মুক্ত করেন। কিউবা এবং সার্বিয়া থেকেও বন্দি মুক্তিতে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁকে আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’-এ ভূষিত করেন।

জেসি জ্যাকসনের মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো যখন বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বিভিন্ন জাদুঘর ও স্থাপনা থেকে ‘আমেরিকা-বিরোধী’ তকমা দিয়ে দাসত্ব বিরোধী প্রদর্শনী সরিয়ে ফেলার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। নাগরিক অধিকার কর্মীদের মতে, এই সময়ে জ্যাকসনের মতো একজন নেতার অনুপস্থিতি সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক বড় শূন্যতা তৈরি করল।

ছবি: রয়টার্স
২০১৭ সালে জ্যাকসন পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘোষণা দেন। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে এবং বর্ণবাদ বিরোধী ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনে তিনি সক্রিয় সংহতি জানিয়েছিলেন।

জেসি জ্যাকসনের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও বর্ণবাদ বিরোধী কর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর সেই অমর উক্তি আজ আবারও সবার মুখে মুখে- ‘আমরা একই সুতোয় বোনা একটি চাদর নই, বরং আমেরিকা হলো বহু রঙের এক বর্ণিল ক্যানভাস’।