আফগানিস্তানে পরিচালিত ‘গজব লিল হক’ সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। এ অভিযানে তালেবানের ৭৪টি চৌকি ধ্বংস করা হয়েছে এবং ১৮টি চৌকি পাকিস্তান বাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলেও দাবি ইসলামাবাদের।
এদিকে অভিযান চলাকালীন পাকিস্তান বাহিনী তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অপ্রমাণিত তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে কোনো পক্ষই এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
যদিও ইউরোপভিত্তিক আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা থিঙ্কট্যাংক সংস্থা ওসিন্ট শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় জানায়, পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর বিশেষ অভিযানের সময় কাবুলে কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারসহ হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা প্রাণ হারান। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি সংস্থাটি।
কে এই হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা?
২০২১ সালে তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে আখুন্দজাদাই ছিলেন দল ও সরকারের প্রধান নীতিনির্ধারক, যার দিকনির্দেশনায় পুরো আফগানিস্তানের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
তিনি ‘শায়খ আল-হাদিস’ নামেও পরিচিত—যা ইসলামী আইন (শরিয়াহ) ও হাদিস বিষয়ে তার বিশেষজ্ঞতার ইঙ্গিত বহন করে।
ধারণা করা হয়, তার বয়স প্রায় ৬০ বছরের কাছাকাছি। তিনি আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের তখতা পুল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
২০১৬ সালে তালেবানের তৎকালীন প্রধান মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর আখুন্দজাদা সংগঠনের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন।
২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা দখলের পর থেকে তিনি বেশিরভাগ সময় জনসমক্ষে না এসে কান্দাহারে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। তার প্রকাশ্য উপস্থিতি খুবই সীমিত।
আসলে কী ঘটেছিল?
পাকিস্তান ‘অপারেশন গজব লিল হক’ ঘোষণা করে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালানোর পরই এ জল্পনার সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভুলভাবে বলা হয়েছিল, কাবুল ছিল হামলার লক্ষ্য। পরে দৃষ্টি ঘুরে যায় কান্দাহারের দিকে, যা ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আখুন্দজাদার প্রধান ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত।
এএফপি জানায়, কাবুলে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিমানের শব্দ, একাধিক বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেছে। একই সময়ে কান্দাহারেও আকাশে বিমান চলাচল নিশ্চিত করেন এএফপির এক সংবাদদাতা।
বিমান চলাচল ও বিস্ফোরণের সময়গত মিল থেকেই অনলাইনে দাবি ওঠে, পাকিস্তান হয়তো নেতৃত্ব পর্যায়ে হামলার চেষ্টা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে আখুন্দজাদা হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলেন।
এখন পর্যন্ত কর্মকর্তারা যা নিশ্চিত করেছেন
তালেবান স্বীকার করেছে যে, পাকিস্তানি বিমান হামলা হয়েছে, কিন্তু কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে—এমন কথা তারা বলেনি।
তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানান, বিমান অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। নেতৃত্বের স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কথাও তিনি উল্লেখ করেননি।
এর আগে মুজাহিদ আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে বড় ধরনের পাল্টা অভিযানের ঘোষণা দেন, যা তার ভাষায় পাকিস্তানের বারবার সীমান্ত লঙ্ঘনের জবাব। পরে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, স্থল সংঘর্ষে আটজন আফগান সেনা নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও আখুন্দজাদাকে লক্ষ্য করে হামলার কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
ইসলামাবাদ জানিয়েছে, তাদের হামলা ছিল বিতর্কিত ডুরান্ড লাইনের কাছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সংশ্লিষ্ট শিবিরগুলোর বিরুদ্ধে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা
সবশেষ গেলো ২২ ফেব্রুয়ারি কথিত টিটিপি অবস্থান লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বিমান হামলার পর সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
পাকিস্তান এই পদক্ষেপকে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে কাবুল ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে আফগান সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তখন থেকে তোরখাম সীমান্ত ক্রসিং এবং স্পিন বোলদাকের কাছে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়েছে।