যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এর বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলা করেছেন। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সাময়িকীটিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্যাটেলের ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাদারিত্ব নিয়ে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ তথ্য প্রকাশের অভিযোগে সোমবার (২০ এপ্রিল) এই মামলা করা হয়। খবর ফক্স নিউজের।
গত ১৭ এপ্রিল ‘দ্য এফবিআই ডিরেক্টর ইজ এমআইএ’ (নিখোঁজ এফবিআই প্রধান) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য আটলান্টিক। সেখানে অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়, কাশ প্যাটেল মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করেন, কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন এবং তার আচরণে সহকর্মীরা উদ্বিগ্ন। এমনকি একটি কম্পিউটারে লগ-ইন করতে না পেরে তিনি ‘মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন’ বলেও দাবি করা হয় প্রতিবেদনে।
প্যাটেলের আইনজীবীরা মামলার নথিতে উল্লেখ করেছেন, দ্য আটলান্টিক এবং এর প্রতিবেদক সারাহ ফিটজপ্যাট্রিক প্যাটেলের সম্মানহানি এবং তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
মামলার আরজিতে বলা হয়, বিবাদিরা এফবিআইয়ের নেতৃত্বের সমালোচনা করার অধিকার রাখেন, কিন্তু তারা প্যাটেলের বিরুদ্ধে স্পষ্টত বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করে আইনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। প্যাটেল দাবি করেছেন, প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি এর তথ্যগুলো ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে সতর্ক করেছিলেন এবং উত্তর দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছিলেন, যা দ্য আটলান্টিক প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে প্যাটেল লিখেন, ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আমার বার্তা হলো—তোমরা যখন আমার নামে মিথ্যা লেখা বন্ধ করবে তখনই আমি চিন্তিত হবো। তোমরা যতো বেশি লিখবে, ততোই স্পষ্ট হবে যে আমি আমার কাজ ঠিকঠাক করছি। তোমাদের কোনো মিথ্যাই এফবিআইকে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে আটকাতে পারবে না।
এদিকে দ্য আটলান্টিক তাদের প্রতিবেদনের সপক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছে। প্রতিবেদনটি এখনও তাদের ওয়েব সাইটে আছে। এক বিবৃতিতে সাময়িকীটি জানায়, আমরা আমাদের প্রতিবেদনের ওপর আস্থা রাখছি এবং আদালতে জোরালোভাবে আমাদের সাংবাদিকতার পক্ষে লড়াই করবো।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এবং ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ কাশ প্যাটেলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, প্যাটেল গত ১৪ মাসে যা অর্জন করেছেন, তা আগের প্রশাসন চার বছরেও করতে পারেনি। নামবিহীন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে চালানো এই আক্রমণ কোনোভাবেই সাংবাদিকতা নয়।
ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে প্যাটেল বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া মিশন সম্পন্ন করতে এবং আমেরিকার সুরক্ষায় কাজ চালিয়ে যাবেন। কোনো ধরনের অপপ্রচার তাকে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।
দ্য আটলান্টিকের সেই প্রতিবেদন
‘দ্য এফবিআই ডিরেক্টর ইজ এমআইএ’ (নিখোঁজ এফবিআই প্রধান)
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেলের রহস্যময় অনুপস্থিতি, মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান এবং অসংলগ্ন আচরণ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সামান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে ‘চাকরিচ্যুতি’ ভেবে তার আতঙ্কিত আচরণ এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতি গোয়েন্দা সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাটি গত ১৭ এপ্রিল শুক্রবারের। সাপ্তাহিক ছুটি শুরুর আগে কাজ গুছিয়ে নেওয়ার সময় কাশ প্যাটেল এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার সিস্টেমে লগ-ইন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।
দ্য আটলান্টিক ৯টি ভিন্ন সূত্রের বরাতে জানতে পারে, লগ-ইন করতে না পেরে প্যাটেল তৎক্ষণাৎ ধরে নেন যে হোয়াইট হাউস তাকে বরখাস্ত করেছে এবং তার এক্সেস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই আতঙ্কে তিনি সহকারী ও মিত্রদের ফোন করে বরখাস্ত হওয়ার খবর দিতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা তার এই আচরণকে ‘ফ্রিক-আউট’ বা চরম উন্মত্ততা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অথচ শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, এটি ছিলো নিছক একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি যা দ্রুত সমাধান করা হয়। ‘কাশ প্যাটেলের চাকরি নেই’ এই বিষয়টিকে এক এফবিআই কর্মকর্তা ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এদিকে কাশ প্যাটেলের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসির বিভিন্ন বেসরকারি ক্লাব ও লাস ভেগাসের পার্টিতে অতিরিক্ত মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছয়জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার মতে, তার মদ্যপানের অভ্যাসের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ও ব্রিফিং পিছিয়ে দিতে হয়েছে। এমনকি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দরজার ওপাশে সাড়া না দেওয়ায় একবার সোয়াট টিমের ব্যবহৃত ‘ব্রিচিং ইকুইপমেন্ট’ চেয়ে পাঠানোর উপক্রম হয়েছিলো। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান চলাকালীন এফবিআই প্রধানের এমন অপ্রাপ্যতা ও অচেতনতা জননিরাপত্তার জন্য বড়ো হুমকি।
এপ্রিলের শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির বিদায়ের পর থেকেই প্যাটেলের পদ হারানোর গুঞ্জন জোরালো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা ইতিমধ্যেই তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। সংস্থার ভেতরেও অনেকে তার অনিয়মিত উপস্থিতিতে হতাশ। এফবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা সবাই শুধু প্যাটেলের বিদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় আছি।
অবশ্য হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কাশ প্যাটেলের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের হার ১০০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। অ্যাক্টিং অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ প্যাটেলের সাফাই গেয়ে বলেছেন, প্যাটেল ১৪ মাসে যা অর্জন করেছেন, আগের প্রশাসন চার বছরেও তা পারেনি। তিনি এসব খবরকে ‘বেনামি সূত্রের অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছেন।
এদিকে এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে প্যাটেলের নামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, সব মিথ্যা। আমি তোমাদের আদালতে দেখে নেবো—চেকবুক নিয়ে এসো।