ওপেক ও ওপেক প্লাস ছাড়ছে আমিরাত: তেলের বাজারে অস্থিরতার শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে যে, ‘জাতীয় স্বার্থে’ মনোযোগ দিতে ওপেক ও ওপেক প্লাস জোট থেকে সরে যাচ্ছে দেশটি।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ আমিরাত অতীতেও ওপেকের উৎপাদন কোটা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। দেশটি আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়বে বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএম প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত আমিরাতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবর্তিত জ্বালানি নীতির প্রতিফলন।

এতে আরও বলা হয়, সংগঠনে থাকার সময়ে আমরা সবার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছি এবং আরও বড় ত্যাগ স্বীকার করেছি। তবে এখন আমাদের জাতীয় স্বার্থ যা নির্দেশ করে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে।

বর্তমানে ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমিরাত উপকূলঘেঁষা এই নৌপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আমিরাতের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব-এর সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ওপেকের ভেতরে সৌদি আরবকে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। 

সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হলো—

১) তেলের দামে অস্থিরতা বাড়তে পারে

ওপেক/ওপেক প্লাসের মূল শক্তি হলো সমন্বিত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ। আমিরাত বের হলে বাজারে সরবরাহ নীতিতে ভাঙন ধরে দামে ওঠানামা বাড়তে পারে।

২) উৎপাদন কোটা ব্যবস্থায় চাপ

আমিরাত নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে স্বাধীন হবে। এতে অন্য সদস্যদের কোটা মেনে চলা দুর্বল হতে পারে।

৩) জোটের ঐক্য প্রশ্নের মুখে

এটি অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটার উৎসাহ দিতে পারে, ফলে জোটের কার্যকারিতা কমবে।

৪) মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক বার্তা

সৌদি নেতৃত্বাধীন তেলনীতির বাইরে গিয়ে আমিরাত স্বাধীন অবস্থান নিলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন বার্তা যাবে।

৫) বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা

আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। জোটের বাধা না থাকলে তারা দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে বাজার দখল বাড়াতে চাইতে পারে।

৬) আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি

সরবরাহ বাড়লে তেলের দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকে—যা বাংলাদেশের মতো আমদানিকারক দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।

৭) রাশিয়া-সৌদি সমন্বয়ে প্রভাব

ওপেক প্লাস কাঠামোতে বড় উৎপাদকদের সমন্বয় দুর্বল হতে পারে, বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে নীতিগত সমঝোতায় প্রভাব পড়তে পারে।

৮) দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে

সমন্বিত নিয়ন্ত্রণের বদলে ‘মুক্ত প্রতিযোগিতা’ বাড়লে দামের স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আমিরাতের এমন সিদ্ধান্ত তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াবে, জোটের শক্তি কমাবে, তবে আমদানিকারক দেশের জন্য কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তির সুযোগও তৈরি করতে পারে।