ইরানকে একযোগে ঘায়েল করার গোপন মিশন ব্যর্থ!

গেলো ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যে অগ্নিকুণ্ড তৈরি হয়েছিল, তা এবার উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ফাটলকে প্রকাশ্য দিবালোকে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন এই ফাটলকে আরও পরিস্কার করেছে।

প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম- ব্লুমবার্গের এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে সৌদি আরব ও কাতারকে সাথে নিয়ে একটি যৌথ সামরিক ফ্রন্ট গঠনের জোর চেষ্টা চালিয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ।

Sheikh Mohamed bin Zayed al-Nahyan
তবে রিয়াদ ও দোহার চরম অনীহা এবং প্রত্যাখ্যানের কারণে আমিরাতের সেই গোপন মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একজোট হওয়া তো দূরের কথা, এই যুদ্ধ উল্টো সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব ও উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২১ সালে নিন্দিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অধীনে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চড়া মাশুল গুনতে হয়েছে আরব আমিরাতকে। যুদ্ধের শুরুতে ইরান যখন উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে, তখন আমিরাতের ওপর আছড়ে পড়ে প্রায় ৩,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। দেশটির পর্যটন ও আর্থিক হাব হিসেবে পরিচিত ইমেজ এই হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Mohammed bin Salman
এই চরম ক্ষোভ থেকে আমিরাত চেয়েছিল পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো মিলে ইরানের ওপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ুক। কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতারি নেতৃত্ব এই প্রস্তাবে সোজা ‘না’ বলে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এমনটা হলে তারা আকাশসীমাও ব্যবহার করতে দেবে না।

ফলে বাধ্য হয়েই সৌদি আরব ও আমিরাত ইরানের ওপর পাল্টা আঘাত হানলেও, তা করেছে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। যেখানে সৌদির হামলা ছিল অত্যন্ত পরিমিত এবং দ্রুতই মিত্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়ে কূটনীতির টেবিলে ফেরে; সেখানে আমিরাত বেছে নেয় চরম আগ্রাসী পথ।

Sheikh Tamim Bin Hamad Al Thani
যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির ঢাকঢোল পেটাচ্ছিলেন, ঠিক সেই এপ্রিলেই মার্কিন নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানের ‘লাভান দ্বীপে’ অবস্থিত বিশাল জ্বালানি কেন্দ্রে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় আমিরাত। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, এই হামলার ফলে সৃষ্ট বিশাল অগ্নিকাণ্ডে ওই ইরানি তেল শোধনাগারের সিংহভাগ ক্ষমতাই মাসের পর মাস অচল হয়ে পড়ে।

শুধু তা-ই নয়, ইরান যখন বৈশ্বিক তেলের রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন সেখানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের অনুমতি চেয়ে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব পাসের ব্যর্থ চেষ্টাও করে আবুধাবি। আমিরাতের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সাথে সুর না মেলানোয় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদকে তীব্র ভাষায় তুলাধোনা করেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ।

তিনি একে জোটের ‘দুর্বলতা’ বলে ক্ষোভ উগড়ে দেন। এই ক্ষোভ ও উত্তেজনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে মে মাসে, যখন আমিরাত আন্তর্জাতিক তেল রফতানিকারক জোট ‘ওপেক’ থেকে নাটকীয়ভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকলেও, ইসরায়েলের সাথে নিজেদের সম্পর্ক এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে আমিরাত। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি তেল আবিবের এক অনুষ্ঠানে গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি থেকে আমিরাতকে বাঁচাতে ইসরাইল তাদের সর্বাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেটি পরিচালনার জন্য স্বয়ং ইসরাইলি সেনা পাঠিয়েছে আবুধাবিতে।

Iran War 03
তবে গাজায় ইসরাইলের নির্মম গণহত্যাকে যেখানে জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসি সরাসরি 'গণহত্যা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, সেখানে ইসরাইলের সাথে এই গভীর পিরিতি জনসমক্ষে স্বীকার করতে চরম অস্বস্তিতে রয়েছে আমিরাত।

সম্প্রতি নেতানিয়াহুর অফিস দাবি করেছে যে যুদ্ধের মাঝেই তিনি আমিরাত সফর করেছেন; কিন্তু আবুধাবি তা পুরোপুরি অস্বীকার করে মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।

বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সৌদি আরবের লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ থাকলেও আমিরাত সরাসরি ইরানের কামানের মুখে দাঁড়িয়ে। আর এই অরক্ষিত অবস্থানের কারণেই হয়তো কূটনীতি ভুলে ইসরাইলের কাঁধে ভর দিয়ে যুদ্ধকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে আবুধাবি।