ইরান-মার্কিন সমঝোতা: দুই নেতার সবুজ সংকেতের অপেক্ষা

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার তিন মাস বয়সী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই দেশের আলোচকরা অবশেষে একটি বড় ধরনের খসড়া চুক্তিতে পৌঁছেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনীতিকরা ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছেন, যার অধীনে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।

তবে পর্দার আড়ালে এই বিশাল অগ্রগতি হলেও, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত রূপ পায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, উভয় পক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপরই এখন ঝুলে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য। মার্কিন নিউজ পোর্টাল ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং মধ্যস্থতায় জড়িত একটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।

Iran Air Defence 02
কেন এই চুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?

চলতি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য বা ‘ব্রেকথ্রু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানোর একটি প্রাথমিক সেতু মাত্র। ট্রাম্পের মূল দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা।

আর সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ৬০ দিনের এই উইন্ডোতে অত্যন্ত নিবিড় ও কঠিন দরকষাকষি করতে হবে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি সবাইকে টেবিলে নিয়ে আসার একটি চুক্তি। আলোচনার টেবিলেই আমরা বাকি সব খুঁটিনাটি বিষয় ঠিক করব।

Iran Air Defence 06
পর্দার আড়ালে যা ঘটেছে

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত মঙ্গলবারই চুক্তির মূল শর্তগুলো দুই পক্ষ মেনে নিয়েছিল। কিন্তু দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত পাওয়া বাকি ছিল। পরবর্তীতে ইরানি আলোচকরা মৌখিকভাবে জানান যে তাঁদের শীর্ষ নেতৃত্ব এই চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে মার্কিন আলোচক দল যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই চুক্তির চূড়ান্ত খুঁটিনাটি নিয়ে ব্রিফ করেন, তখন ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এতে সই করেননি।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন, এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি আরও দু-একদিন ভেবে দেখতে চান। বুধবারও ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, তাঁর কোনো তাড়া নেই। তাছাড়া, এর আগেও কয়েকবার দুই পক্ষ চুক্তির কাছাকাছি গিয়েও শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল।

US Iran War 01
হরমুজ প্রণালী ও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি

৬০ দিনের এই খসড়া সমঝোতা স্মারকে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয় যুক্ত করা হয়েছে:

হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ‘অবাধ’ করতে হবে। কোনো ধরনের ট্রাফিক হয়রানি বা টোল) আদায় করা যাবে না। এছাড়া ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই কৌশলগত জলপথ থেকে সব মাইন অপসারণ করতে হবে।

নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার: ইরান যদি বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে পারে, তবে তার অনুপাত বা সামঞ্জস্য রেখে আমেরিকাও তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। এছাড়া ইরান যাতে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করবে।

পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি: এই ৬০ দিনে ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। আলোচনার প্রথম এজেন্ডাই হবে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কীভাবে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা যায় এবং তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা কতটুকু হবে।

তহবিল অবমুক্তকরণ ও মানবিক সহায়তা: আলোচনার অংশ হিসেবে আমেরিকা ইরানের ফ্রিজ বা জব্দ হয়ে থাকা অর্থ অবমুক্ত করা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান যাতে জরুরি পণ্য ও মানবিক সহায়তা পেতে শুরু করে, সে জন্য একটি বিশেষ মেকানিজম বা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে।

লেবানন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত: এই চুক্তির একটি অন্যতম শর্ত হলো, লেবাননে ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধও চিরতরে বন্ধ হতে হবে। এই বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে অন্তত একবার বেশ উত্তপ্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।

US Iran War 05
টেবিলে চুক্তি, সমুদ্রের বুকে সংঘাত

কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! যখন দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিবিদরা হোটেলে বসে এই শান্তি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করছিলেন, ঠিক তখনই গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ইরানি নৌবাহিনীর মধ্যে অন্তত দুটি ছোটখাটো সামরিক সংঘর্ষ ঘটেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের সামনে এখন তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। ইরানের শাসনব্যবস্থার মধ্যেও এমন কিছু মানুষ আছেন যারা বোঝেন যে দেশের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এটাই সেরা সময়। তবে যদি এই ৬০ দিনের আলোচনায় প্রমাণিত হয় ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে দেয়া কথা রাখছে না, তবে ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক, সব ধরনের কঠোর পথই খোলা থাকবে। এমনকি গালফ অঞ্চলে পাঠানো অতিরিক্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিও নির্ভর করছে এই চুক্তির চূড়ান্ত সফলতার ওপর। কোনো গোপন চুক্তি বা ব্যাকডোর ডিল ছাড়াই, সম্পূর্ণ সরাসরি টেবিল টকের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় ওয়াশিংটন। এখন পুরো বিশ্বের নজর ট্রাম্প ও তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।