যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ক্ষমতার মূল কেন্দ্রগুলোতে প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার জন্য কয়েক দশক ধরে চলা রক্ষণশীল আইনি প্রচেষ্টার বড়ো জয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে। এর মাধ্যমে উল্টে গেছে ১৯৩৫ সালের ‘হামফ্রিস এক্সিকিউটর বনাম ইউনাইটেড স্টেটস’ নামক ৯১ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক আইনি নজির।
সোমবার আদালতের রক্ষণশীল বিচারপতিদের দ্বারা চালিত ৬-৩ ব্যবধানের এই রায়ে নির্ধারিত হয়েছে যে, কংগ্রেসের আইনে অপসারণের সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও একজন প্রেসিডেন্ট যেকোনো সময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগকারী স্বাধীন সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণ করতে পারবেন। মার্কিন সরকারের নির্বাহী শাখার ওপর রাষ্ট্রপতির একক কর্তৃত্ব রয়েছে—এই রক্ষণশীল ‘একক নির্বাহী’ তত্ত্বেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেলো সর্বোচ্চ আদালতের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে।
এই রায়ের ফলে ডেমোক্র্যাটিক দলের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) সদস্য রেবেকা স্লটারকে ট্রাম্পের বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তটি বৈধতা পেলো। জো বাইডেন কর্তৃক নিযুক্ত স্লটারের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত থাকার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের মার্চে ট্রাম্প তাকে বরখাস্তের পদক্ষেপ নেন। স্লটার এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে ১৯১৪ সালের একটি আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছিলেন, অদক্ষতা বা অসদাচরণ ছাড়া শুধু নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে প্রেসিডেন্ট স্বাধীন কমিশনারদের অপসারণ করতে পারেন না। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত তার সেই দাবি খারিজ করে ৯১ বছর আগের নজিরটি পুরোপুরি বাতিল করে দেন। আদালতের তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি অবশ্য এই সিদ্ধান্তের তীব্র ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘প্রশাসনিক রাষ্ট্র’ —যার আওতাধীন ফেডারেল সংস্থাগুলো দেশের অর্থায়ন, বিমান চলাচল নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শ্রম সম্পর্কের মতো আমেরিকান জীবন ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ন্ত্রণ করে—তার ওপর একটি মারাত্মক আঘাত। এতোদিন এই সংস্থাগুলো রাষ্ট্রপতির সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত ছিলো।
নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন স্কুলের অধ্যাপক মাইকেল গেরহার্ড এই রায়কে ‘কয়েক দশকের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্প্রসারণকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যোগ করেন, এর ফলে স্বাধীন প্রশাসনিক রাষ্ট্রটি প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
একইভাবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি স্কুল অফ ল-এর অধ্যাপক জন ইউ মামলাটির নাম ‘ট্রাম্প বনাম স্লটার’ উল্লেখ করে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে অন্য যেকোনো একক মামলার চেয়ে এই রায়ে রাষ্ট্রপতি পদ একবারে সর্বাধিক সাংবিধানিক ক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশে এখন আর স্বাধীন প্রশাসনিক রাষ্ট্র বলে কিছু রইলো না।
প্রেশনের ওপর প্রেসিডেন্টের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই রায় দিলেও, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ (ফেড)-এর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না করার ইঙ্গিত দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিরা মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি ‘অনন্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের’ অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সোমবারই অপর একটি আলাদা মামলায় ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার অনুমতি চাইলে সর্বোচ্চ আদালত তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
উইসকনসিনের মার্কেট ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ক্রিস্টিন চ্যাবটসহ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, আদালত এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে এই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেলো, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই নিজের ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করে চলেছেন।