বিভাজনের সুর: টুকরো টুকরো হওয়ার শঙ্কায় যুক্তরাজ্য!

যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ ও অখণ্ডতা নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড, এই তিনটি অঞ্চলই একযোগে স্বাধীনতার পক্ষের বা বর্তমান ইউনিয়নবিরোধী রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার ওয়েস্টমিনস্টারের ওপর চাপ বাড়াতে ও নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করতে যাচ্ছেন আঞ্চলিক সরকারগুলোর শীর্ষ নেতারা।

সোমবারে কার্ডিফের পাঁচ তারকা 'সেন্ট ডেভিডস হোটেলে' আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনে ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ ইওরওয়ার্থ, স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও'নিল এবং সিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড একত্রিত হচ্ছেন। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একযোগে রাজনৈতিক লড়াই পরিচালনা এবং নিজ নিজ দেশের জন্য স্বাধীনতার রেফারেন্ডাম বা গণভোটের অধিকার দাবি করা।

UK Break Up 04
তিন অঞ্চলের নেতারা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করে একটি যৌথ স্মারকে সই করবেন। এতে স্পষ্ট বলা হবে যে, কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা ওয়েস্টমিনস্টার একা তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না। তারা কেবল স্বাধীনতার দাবিই নয়, বরং অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং আন্তর্জাতিক নীতিতে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই তিন রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনোভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফেরার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকার যেখানে ইউনিয়ন ধরে রাখতে মরিয়া, সেখানে সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের একটি বক্তব্য চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি হাউজ অফ কমন্সে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, স্পষ্ট জনমত থাকলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার গণভোট বিবেচনা করা যেতে পারে। জাতীয়তাবাদীরা এই সুযোগটি কাজে লাগালে পরবর্তীতে বার্নহ্যাম সুর বদলে স্কটিশ ফার্স্ট মিনিস্টারকে চিঠি দিয়ে জানান, তাঁর সরকার কোনো গণভোট অনুমোদন করবে না এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনীতিতেই তাদের পূর্ণ মনোযোগ থাকবে।

UK Break Up 05
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের যুগান্তকারী মোড় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইতিহাসের প্রথমবারের মতো তিন অঞ্চলই স্বাধীনতাপন্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা আর টেকসই নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বার্নহ্যাম হয়তো ইতিহাসজুড়ে যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই চিহ্নিত হতে যাচ্ছেন।

আইরিশ ঐক্যের দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য। ডাবলিনে এক সফরে গিয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, তিনি আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ দেখতে চান এবং এটি হবে একটি দুর্দান্ত ঘটনা। সাবেক ও বর্তমান কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন একতরফা অবস্থান একেবারেই নজিরবিহীন, যা যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও গুড ফ্রাইডে চুক্তির আওতায় থাকা উত্তর আয়ারল্যান্ডের রাজনীতিতে বিশাল আলোড়ন তৈরি করেছে।

UK Break Up 01
মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলস লেবার পার্টির দুর্বল পারফর্ম্যান্সের সুযোগে প্লাইড কামরি বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং রুন আপ ইওরওয়ার্থ ফার্স্ট মিনিস্টার হন। স্কটল্যান্ডে এসএনপি এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইন তাদের অবস্থান আগের চেয়ে আরও সুসংহত করেছে। প্লাইড কামরি ইতিমধ্যেই ওয়েল্সের নিজস্ব কর ব্যবস্থা, বার্নেট ফর্মুলা সংশোধন এবং উইন্ড ফার্ম রাজস্বের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে।

তিনটি অঞ্চলই যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েস্টমিনস্টারের বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে নিজেদের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবির স্বপক্ষে দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণায় নামে, তবে তা পুরো যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ভৌগোলিক কাঠামো বদলে দিতে পারে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই কেন্দ্রের ওপর জাতীয়তাবাদীদের এই চাপ ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে-ফাস্টপোস্ট-দ্য টেলিগ্রাফ