প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে কঠিন সময়ে ঠেলে দেয়। তেমনি মরক্কোর ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময়ও এমন সব গল্প রচিত হয়েছে। দেশটিতে ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়লে তায়েব আইত ইগেনবাজ তার ১১ বছরের ছেলেকে বা তার মা-বাবাকে বাঁচাবেন কিনা, তা বেছে নিতে বাধ্য হন।
এটলাস পর্বতমালার একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের মেষপালক বলেছেন, তাকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো তাতে তিনি এখনও আতঙ্কিত। গেলো শুক্রবার রাতে যখন দেশটিতে ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে তখন তায়েব তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও বাবা-মায়ের সাথে তাদের ছোট পাথরের বাড়িতে ছিলেন।
বিবিসির সংবাদদাতা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান ভূমিকম্পে তায়েবের বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে দেখিয়ে তায়েব বলেন, ওরা সেখানেই ছিলো। ভূমিকম্প হলে আমরা সবাই দরজার দিকে দৌড়ে যাই। আমার বাবা ঘুমাচ্ছিলেন এবং আমি আমার মাকে বেরিয়ে আসার জন্য চিৎকার করে ডাক ছিলাম। কিন্তু মা ঘরের শেষ প্রান্ত থেকে আমার অপেক্ষায় ছিলেন।
অন্যদিকে, তায়েক কেবল তার স্ত্রী এবং কন্যাকে দেখতে পান। ভেঙ্গে পড়া ঘরটি থেকে তায়েব যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সেখান ছেলে এবং তার বাবা-মা দু’জনকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি দেখতে পান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে তার ছেলের হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করছে।
তিনি জানতেন যে, তাকে দ্রুত কাজ করতে হবে। তায়েব তার ছেলে অ্যাডামের দিকে এগিয়ে গেলেন, তাকে বের করার জন্য ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে মরিয়া হয়ে খনন চালালেন। পাথরের বড় স্ল্যাবের নিচে আটকে থাকা তার বাবা-মায়ের দিকে ফিরে তায়েব জানালো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সেই কষ্টের মুহূর্ত স্মরণ করে চোখের জলে তায়েব বলেন, আমাকে আমার বাবা-মা এবং ছেলের মধ্যে বেছে নিতে হয়েছিলো। আমি আমার মা-বাবাকে সাহায্য করতে পারিনি। কারণ তাদের শরীরের অর্ধেকের উপরে দেয়াল পড়ে গেছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমি আমার মা-বাবাকে মরতে দেখেছি।
তায়েব তার হালকা রঙের জিন্সের ওপর একটি দাগের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এটা তার বাবা-মায়ের রক্ত। তার সব জামাকাপড় তার বাড়িতে আছে এবং ভূমিকম্পের পর থেকে কোথাও যেতে পারেননি। পরিবারটি এখন তাদের পূর্বের বাড়ির কাছে অস্থায়ী তাঁবুতে আত্মীয়দের সাথে বসবাস করছে।
তায়েব বলেন, তার সব টাকা ঘরে ছিল এবং তার বেশিরভাগ মেষ মারা গেছে। এটা আবার নতুন জীবনে জন্ম নেওয়ার মতো। বাবা-মা নেই, ঘর নেই, খাবার নেই, কাপড় নেই। আমার এখন ৫০ বছর বয়স এবং আমাকে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হবে। তবে আমি মনোবল হারায়নি।
তবে কীভাবে নতুন করে আবারও জীবন শুরু করবেন সে সম্পর্কে এখনই কিছু ভাবতে পারছেন না তায়েব। তবে বাবা-মায়ের শিক্ষা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। বাবা-মা তাকে সব সময় বলতেন, ধৈর্য ধরো, কঠোর পরিশ্রম করো, কখনও হাল ছেড়ে দিও না। এ সময় তায়েবকে জড়িয়ে ছিলো তার ছেলে এডাম।
বিধ্বস্ত আমিজমিজ শহরের আরেকজন বাবা ও ছেলে একে অপর জড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যাদের গল্পও অনেকটা তায়েবের মতো। আব্দুল মাজিদ আইত জাইফার জানান, ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় তিনি তার স্ত্রী এবং তিন সন্তানের সাথে বাড়িতে ছিলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির মেঝে ভেঙ্গে পড়ে।
তার ছেলে ১২ বছর বয়সী মোহাম্মদ ঘর থেকে থেকে বেরিয়ে গেলেও পরিবারের বাকিরা আটকে পড়ে। সেই কথা স্মরণ করে আব্দুল মাজিদ বলেন, তার পা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিল, কিন্তু প্রতিবেশী তাকে টেনে বের করে আনে। এরপর তিনি তার স্ত্রী ও তার এক মেয়েকে উদ্ধার করতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তোলার সময় দুজনেই মারা যায়। পরদিন তার অপর মেয়ের লাশও ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে আনা হয়। ৪৭ বছরের আব্দুল মজিদ এখন তার বাসা থেকে রাস্তার পাশে তাঁবুর নিচে থাকেন।