এআই দিয়ে বোমা ও রণকৌশল তৈরি করছে জঙ্গিরা!

নাইজেরিয়ার কুখ্যাত ও দুর্ধষ জঙ্গি গোষ্ঠী বোকো হারাম এবং এর সহযোগী সংগঠন আইএসডব্লিউএপি’র যোদ্ধারা এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে মারাত্মক সব বোমা তৈরি, সামরিক আক্রমণের নিখুঁত পরিকল্পনা এবং যুদ্ধের ময়দানের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো কাজগুলো সহজেই সেরে ফেলছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে।

গবেষকেরা বোকো হারামের দুই উপদল- আইএসডব্লিউএপি এবং জাস-এর ২৭ জন সাবেক সদস্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, সেম অল্টম্যানের ওপেনএআই’র 'চ্যাটজিপিটি', অ্যানথ্রোপিকের 'ক্লড', গুগলের 'জেমিনি', ইলন মাস্কের 'গ্রক', মার্ক জাকারবার্গের 'মেটা এআই' এবং চীনের 'ডিপসিক'-এর মতো শক্তিশালী এআই প্ল্যাটফর্মগুলো তারা নিয়মিত সামরিক ও কারিগরি পরামর্শের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করত।

Boko Haram 01
ক্যামব্রিজের গবেষণা বলছে, উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের ঘাঁটিতে এআই ব্যবহারে এক অভাবনীয় শৃঙ্খলা ও আধুনিকতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর নিয়ে এসে কমান্ডো ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের চ্যাটবটে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় এবং কীভাবে এআই-এর নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন করতে হয় তা শিখিয়েছে।

এই কাজে শুধু সাধারণ যোদ্ধারাই যুক্ত ছিল না; বরং সোলার পাওয়ার চালিত ঘরে ২৩ সদস্যের একটি বিশেষ এআই প্রযুক্তি ইউনিট গঠন করা হয়, যেখানে প্রকৌশলী, অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও বোমা প্রস্তুতকারকেরা নিয়োজিত ছিল।

গবেষণার প্রধান গবেষক আন্তোনিয়া জুলিক জানান, আগে বোমা তৈরির নির্দেশনা কেবল ম্যানুয়াল বা ইন্টারনেটে সীমিত ছিল, কিন্তু এআই-এর কারণে এখন জঙ্গিরা চ্যাটবটের কাছে নিজেদের কাছে থাকা নির্দিষ্ট উপকরণগুলোর নাম বলে তাৎক্ষণিক পরামর্শ পাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা উপলব্ধ একজন 'কারিগরি বিশেষজ্ঞের' মতো চ্যাটবট তাদের বোমা আরও শক্তিশালী করা এবং অব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম থেকে বিস্ফোরক পুনরুদ্ধারের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে।

এমনকি যুদ্ধের ময়দানে ক্যামেরায় তোলা ছবি চ্যাটবটে আপলোড করে কমান্ডারের মাধ্যমে নতুন সামরিক নির্দেশনা পৌঁছানো, না ফোটা বোমা থেকে নিরাপদে বারুদ বের করা, কিংবা অচেনা ফায়ার আর্মস পরিচালনার কৌশল জানার ক্ষেত্রেও ‘গ্রককে গিয়ে জিজ্ঞেস করো’ এমন চর্চা শুরু হয়েছে। কোনো হামলায় ব্যর্থ হলে সেই কৌশল এআই’কে দিয়ে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী রণকৌশল সাজানোর কাজেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

Boko Haram 02
আল জাজিরার হাতে আসা এক এক্সক্লুসিভ তথ্যে দেখা গেছে, আইএসের গোপনসব  কারিগরি ফোরামে সমর্থকেরা কীভাবে এআই-এর 'সেফটি গার্ডরেল' ভেঙে বিপজ্জনক তথ্য বের করতে হয় তার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এক ব্যবহারকারী এটিকে গাড়ির ‘স্পিড লিমিটার খুলে ফেলা’র সাথে তুলনা করেছেন।

যদিও ওপেনএআই, মেটা, অ্যানথ্রোপিক ও গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই-কে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি বহাল রাখার দাবি করেছে, তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অ্যানথ্রোপিক প্রধান ডারিও আমোদেই এআই-এর নিরাপত্তা যাচাইয়ে গতি কমানোর আহ্বান জানালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন শিথিল ও ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি দিয়েই যদি জঙ্গিরা এত ভয়াবহ গতি অর্জন করতে পারে, তবে ২০২৬ সালের আজকের এই অতি-উন্নত এআই যুগে এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য কত বড় হুমকির কারণ হতে পারে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা