সকালে ইরান, বিকেলে রাশিয়া: ট্রাম্পের কূটনীতিতে সংশয়ে বিশ্ব

ব্যবসায়িক চুক্তিতে অভ্যস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনীতি এবার এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো। মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ট্রাম্পের দুই ঘনিষ্ঠ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার একই দিনে দুটি ভিন্ন ও অত্যন্ত জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকট (ইরানের পারমাণবিক অচলাবস্থা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ) নিয়ে আলোচনায় বসেন। তবে এই 'শাটল ডিপ্লোম্যাসি' বা দ্রুতগতির কূটনীতি আন্তর্জাতিক মহলে সুফল পাওয়ার চেয়ে সংশয়ই বেশি তৈরি করেছে।

এক দিনে দুই ফ্রন্টে আলোচনা: জেনেভায় অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি দলটি প্রথমে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় বসেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টার এই আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তির আভাস পাওয়া যায়নি।


ইরান পর্ব শেষ হতে না হতেই মার্কিন দলটি ছুটে যায় ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে, যেখানে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে দুই দিনব্যাপী আলোচনার প্রথম ধাপ শুরু হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি এক দিনেই এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও ‘ওভারস্ট্রেচ’ বিতর্ক: পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প কূটনীতির গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, একই সময়ে একই স্থানে দুটি ভিন্ন জটিল ইস্যু সামলানো যুক্তিহীন। এটি কূটনীতির গভীর কাজের চেয়ে লোক দেখানো প্রচেষ্টাই বেশি মনে হচ্ছে।

রয়টার্সের কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যপ্রাচ্যের এক কর্মকর্তা এই পরিস্থিতিকে একটি জরুরি বিভাগের সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে একজন ডাক্তার দুজন মুমূর্ষু রোগীকে একসাথে দেখছেন। তাঁর মতে, এর ফলে কোনো সংকটের দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যা ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রশাসনিক শূন্যতা:  বৈরুত ভিত্তিক কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মোহনাদ হাজ-আলি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, উইটকফ ও কুশনারের মতো নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের দিয়ে বিশ্বের সব জটিল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা একটি 'ভীতিকর বাস্তবতা'।


সমালোচকদের মতে, আব্বাস আরাগচির মতো ঝানু কূটনীতিক বা রুশ প্রতিনিধিদের মোকাবিলা করার মতো গভীর জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা তাদের নেই। এমনকি এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর অনুপস্থিতিও অনেক প্রশ্ন উসকে দিয়েছে।

ট্রাম্প শিবিরের আত্মপক্ষ সমর্থন: হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আন্না কেলি অবশ্য এই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে এবং শান্তি চুক্তির পথে ট্রাম্প ও তাঁর দল যে ভূমিকা রাখছেন তা অন্য কেউ করতে পারেনি। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, প্রথাগত কূটনীতি বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়েছে বলেই ট্রাম্প তাঁর বিশ্বাসভাজন ও দক্ষ 'ডিল-মেকার'দের ওপর ভরসা করছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তার প্রতিফলন এই দ্রুতগতির কূটনীতিতে স্পষ্ট। তবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল থেকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বিদায় করার ফলে মার্কিন কূটনীতির যে 'শূন্যতা' তৈরি হয়েছে, তা উইটকফ ও কুশনার পূরণ করতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স