২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার পর হাভানার রাস্তায় যখন উইল স্মিথ বা রিহানার মতো তারকারা ঘুরে বেড়াতেন, তখন ম্যান্ডি প্রুনার মতো ক্ল্যাসিক গাড়ি চালকদের সুদিন ছিল। কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
বর্তমানে কিউবা তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির অস্তিত্বকেই সংকটের মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ভেনেজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবার জ্বালানি ভাণ্ডার প্রায় শূন্য। এর প্রভাব পড়েছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে দেশটির অধিকাংশ স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কর্মীদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
জ্বালানির অভাবে আবর্জনা পরিষ্কারের ট্রাক চলতে না পারায় পাড়ায় পাড়ায় ময়লার স্তূপ জমেছে। রাতে পুরো হাভানা শহর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে থাকে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষের আলোচনার একমাত্র বিষয়, কখন বিদ্যুৎ আসবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রাশিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের নাগরিকদের কিউবা ভ্রমণে সতর্ক করেছে।
এমনকি প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার আয় এনে দেওয়া বিখ্যাত 'হাবানোস চুরুট উৎসব' বাতিল করা হয়েছে। জ্বালানির অভাবে নিকেল ও কোবাল্ট খনির কাজও বন্ধ করে দিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।
ম্যান্ডি প্রুনার মতো পর্যটন খাতের কর্মীরা দিশেহারা। প্রুনা আক্ষেপ করে বলেন, আমার কাজের জন্য গ্যাস দরকার, পর্যটক দরকার। এখন কোনোটিই নেই। দীর্ঘ ২০ বছর ক্ল্যাসিক গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা প্রুনা এখন দেশ ছেড়ে স্পেনে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছেন।
কিউবার খাদ্য চাহিদার সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। কিন্তু বর্তমানে হিমায়িত খাবার সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না থাকায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম স্থগিত করছে। বাজারে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও এবং মারিয়া এলভিরা সালাজার কিউবার ওপর পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে একটি মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল দেশবাসীকে ‘সৃজনশীল প্রতিরোধ’ করার এবং ‘যুদ্ধকালীন মানসিকতা’ ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের এখন যা উৎপাদিত হয় তা-ই খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে। তবে হাভানার বাজারগুলোতে সবজি বিক্রেতারা সতর্ক করছেন, জ্বালানির অভাবে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে পণ্য আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কিউবা সরকার তাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্মুক্ত না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক এই দড়িটানাটানির মাঝে ১ কোটি কিউবান নাগরিকের জীবন এখন এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তথ্য সূত্র: সিএনএন