শনিবারের ব্যাপক আশাবাদের পর ২৪ ঘণ্টা পার হতেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে কিছুটা জল ঢেলে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার তিনি তাঁর প্রতিনিধিদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের সাথে কোনো চুক্তি করার ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করা না হয়। ট্রাম্পের এই বার্তার পর হোয়াইট হাউসও আগের দিনের তুলনায় সুর নরম করে জানিয়েছে, তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানের পথে কোনো ‘আসন্ন বা দ্রুত সাফল্য’ এখনই আশা করা ঠিক হবে না।
ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, যতক্ষণ না একটি চুক্তি চূড়ান্ত, প্রত্যয়িত এবং স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানি জাহাজের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে। উভয় পক্ষকে পর্যাপ্ত সময় নিতে হবে এবং একটি নিখুঁত চুক্তি করতে হবে।

নেপথ্যে সেই পুরনো জটিলতা: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের পর ইরানের সরকারি পর্যায় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির বিপ্লবী গার্ডসের (আইআরজিসি) সাথে সম্পৃক্ত সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ দাবি করেছে, একটি সম্ভাব্য চুক্তির বেশ কিছু জায়গায়, বিশেষ করে বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়ে আমেরিকা এখনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
এর আগের দিন ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার লক্ষ্যে একটি শান্তি চুক্তির রূপরেখা তারা ‘মোটামুটি আলোচনা’ করে ফেলেছেন। উল্লেখ্য, এই সংকটের আগে বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ দিয়েই পরিবাহিত হতো।
তবে প্রারম্ভিক এই অগ্রগতির পরও বেশ কিছু জটিল ইস্যুতে দুই পক্ষ এখনও অনড় অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ, তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশি ব্যাংকে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের হাজার হাজার কোটি ডলারের তেল রাজস্ব ফেরত দেওয়ার মতো বিষয়গুলো।

চুক্তির ভেতরের খতিয়ান: ট্রাম্প প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইরানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা খুব দ্রুত কাজ করে না, তাই রোববারের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি আলোচনার মূল দিকগুলো তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ইরান ‘নীতিগতভাবে’ হরমুজ খুলে দিতে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধ্বংস বা অপসারণ করতে রাজি হয়েছে, যার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে। আমেরিকার বিশ্বাস, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সবুজ সংকেত নিয়েই এই রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে জাতিসংঘের পরমাণু ওয়াচডগের (আইএইএ) অধীনে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তরলীকরণ বা মিশ্রণের মাধ্যমে ফয়সালা করার একটি বাস্তবসম্মত সূত্র পাওয়া যেতে পারে। ইরান বরাবরই পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের দাবি জানিয়ে আসছে। মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার কাজ হবে, আর পারমাণবিক বিষয়ের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

আমেরিকায় ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা: এই যুদ্ধ মার্কিন বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে, যার ফলে ট্রাম্পের জনসমর্থনে বড় ধাক্কা লেগেছে এবং কংগ্রেসে তাঁর যুদ্ধকালীন ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টাও চলছে। আর এ কারণেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা এই যুদ্ধ থামাতে এপ্রিলের শুরু থেকে চলমান যুদ্ধবিরতির মাঝে ট্রাম্প একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।
তবে চুক্তির খাসড়া বাইরে আসতেই ট্রাম্পের ওপর নিজ দেশের ভেতরে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা দাবি করেছেন, এই চুক্তিতে ওবামা আমলের ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির চেয়ে নতুন কিছু নেই, যে চুক্তি থেকে ট্রাম্প নিজেই তাঁর প্রথম মেয়াদে বের হয়ে গিয়েছিলেন।
সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য ক্রিস ভ্যান হোলেন ফক্স নিউজকে বলেন, “এটি একটি মস্ত বড় ভুল। এই চুক্তি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যখন নিজেই গর্ত খুঁড়ছেন, তখন গর্ত খোঁড়া বন্ধ করাই বুদ্ধিমানের কাজ, আমেরিকা এখন সেটাই করছে।”
সমালোচকদের এই আক্রমণ অবশ্য মুখ বুজে সহ্য করেননি ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে পাল্টা ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি লিখেছেন, আমি যদি ইরানের সাথে চুক্তি করি, তবে সেটি একটি চমৎকার এবং উপযুক্ত চুক্তিই হবে। তাই ব্যর্থ লোকের কথা শুনবেন না, যারা নিজেরা কিছু না জেনেই সব বিষয়ে সমালোচনা করে।

জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের ক্ষত: হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতা এখনও কাটেনি। খামেনির একজন সামরিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, হরমুজ পরিচালনার আইনি অধিকার একমাত্র তেহরানেরই রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩৩টি জাহাজ ইরানের অনুমতি নিয়ে এই প্রণালী পার হতে পেরেছে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের স্বাভাবিক দিনের (১৪০টি জাহাজ) তুলনায় অনেক কম।
আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির প্রধান গত সপ্তাহে সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও হরমুজ দিয়ে তেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের আগে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে এই চুক্তি বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিলেও বৈশ্বিক জ্বালানি, সার ও খাদ্য সংকট এখনই কাটছে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই মার্কিন-ইসরাইলি বোমা হামলায় ইরানের হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। একইভাবে লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জবাবে ইসরাইল এবং পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়ও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফলে এই যুদ্ধ ও ধ্বংসের খতিয়ান মাথায় নিয়ে ট্রাম্পের এই ‘ধীরে চলো’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
