আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করার পর এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের রায়ে পিছু না হটে বরং আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বিশ্বজুড়ে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের নতুন ঘোষণা দিয়েছেন, যা বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
গত বছর ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ ব্যবহার করে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে রায় দিয়েছে যে, এই আইন ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বহির্ভূত।
আদালতের এই রায়কে ‘আমেরিকা বিরোধী’ ও ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প। তিনি এই রায়ের জন্য দায়ী বিচারকদের কঠোর সমালোচনা করে তাদের ‘বোকা’ বলে সম্বোধন করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই রায়ের পক্ষে ভোট দেওয়া তিন বিচারককে স্বয়ং ট্রাম্পই মনোনীত করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে শুল্ক বাতিল হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। এবার তিনি ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহার করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই আইনের অধীনে তিনি শুল্কের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইন অনুযায়ী, এই কর কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই অন্তত পাঁচ মাস চালু রাখা সম্ভব। মঙ্গলবার থেকেই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই নতুন সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এই দেশগুলো আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ১০ শতাংশ শুল্কের চুক্তি করেছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন ‘সেকশন ১২২’ এর আওতায় এই দেশগুলোকেও ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে।
তবে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, ওষুধ ও গাড়ির মতো নির্দিষ্ট কিছু খাতের পূর্ববর্তী চুক্তি বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এই অনিশ্চয়তাকে জার্মানির চ্যান্সেলর অর্থনীতির জন্য ‘বিষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি হলো, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে এই শুল্ক প্রয়োজন। তবে চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের এই নীতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
ইস্পাত কারখানার মালিকরা যেখানে এই পদক্ষেপে হতাশ, সেখানে সয়াবিন চাষিরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে তাদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন।
আদালতের রায়ের ফলে ইতোমধ্যে সংগৃহীত প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক সংগঠন এই টাকা ফেরতের দাবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ট্রাম্প সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, আইনি লড়াই ছাড়া কোনো অর্থ ফেরত দেয়া হবে না এবং এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই শুল্কযুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও মুক্ত বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।