পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং এর পরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। রোববার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তজনা ও যুদ্ধের আশঙ্কার মাঝেই আগামী মার্চের শুরুতে উভয় পক্ষ পুনরায় আলোচনায় বসতে পারে।
দশকব্যাপী চলা এই পারমাণবিক বিরোধ মেটাতে চলতি মাসের শুরুর দিকে দুই দেশ নতুন করে আলোচনা শুরু করে। তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক উপস্থিতি এই অঞ্চলে একটি বড় মাপের যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মার্কিন বাহিনী হামলা চালালে তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে।
নিষেধাজ্ঞার ‘রোডম্যাপ’ নিয়ে দ্বন্দ্ব: ইরানি কর্মকর্তা বলেন, গত দফার আলোচনায় দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আওতা এবং মেকানিজম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাভাবনা ইরানের দাবির চেয়ে ভিন্ন। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক সময়সীমা বা টাইম টেবিলে পৌঁছানো উভয় পক্ষের জন্যই জরুরি। এই রোডম্যাপ অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে হতে হবে।
এর আগে গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই একটি পাল্টা প্রস্তাবের খাসড়া তৈরি করা হবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের ওপর একটি ‘সীমিত সামরিক হামলার’ কথা বিবেচনা করছেন।

সমঝোতার ইঙ্গিত: অতীতের আলোচনার মতো এবারও শূন্য সমৃদ্ধকরণের মার্কিন দাবি তেহরান প্রত্যাখ্যান করলেও নিজেদের পারমাণবিক কার্যক্রমের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। ওয়াশিংটন মনে করে, ইরানের ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার দাবি করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে হবে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ মাত্রা থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে।
ইরানি কর্মকর্তা জানান, তেহরান তাদের এই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুতের একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি করা, মজুতকৃত ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে দেওয়া এবং একটি আঞ্চলিক সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে। তবে এর বিনিময়ে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণু সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতি চায় তেহরান। তিনি আরও যোগ করেন, আলোচনা অব্যাহত আছে এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব: ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, একটি কূটনৈতিক সমাধান তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়ের জন্যই অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে। ওই কর্মকর্তা জানান, আলোচনাধীন অর্থনৈতিক প্যাকেজের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের তেল শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ইরান তাদের তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেবে না। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইরানের একটি অর্থনৈতিক অংশীদার হতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরানের তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে ঠিকাদার হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেতে পারে।
