ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এক সপ্তাহ পার করলেও, এই যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলে চরম উত্তেজনা ও দ্বিধাবিভক্তি বিরাজ করছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা, যারা শুরুতে এই যুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিলেন, এখন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছাপূরণে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন, যদিও যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ এখনো কারো জানা নেই।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি একজন সাবেক মেরিন এবং বিদেশি যুদ্ধের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত, শুরুতে এই যুদ্ধের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বুঝলেন ট্রাম্প পিছু হটবেন না, তখন তিনি তার অবস্থান বদলে ফেলেন। বর্তমানে তিনি দ্রুত ও চূড়ান্ত আঘাতের পক্ষে সওয়াল করছেন যাতে আমেরিকান হতাহতের সংখ্যা কমানো যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের এই সমর্থন একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য যে ‘যুদ্ধবিরোধী’ জনভিত্তি তৈরি করেছিলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা আমেরিকান সৈন্য মারা গেলে তা বড় হুমকির মুখে পড়বে।
হোয়াইট হাউসের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তি কাজ করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলা অভিযানের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই ইরান যুদ্ধে জড়ানোয় তিনি শুরুতে খুব একটা উৎসাহ দেখাননি। বর্তমানে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া হাজারো আমেরিকানকে উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত।
জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ ড্যান কেইন যুদ্ধের নেতিবাচক সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে বারবার সতর্ক করেছেন। আর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভেতরে এখন প্রধান দুশ্চিন্তা হলো আমেরিকার অস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসা এবং যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ আমেরিকানদের পকেটে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। আমেরিকায় পেট্রোলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের ঘরোয়া অর্থনীতির সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছে। তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সরকারিভাবে বিমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যাতে সরবরাহ সচল রাখা যায়। তবে বাজার এখনো স্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করছে, তাদের লক্ষ্য ‘শাসন পরিবর্তন’ নয়, বরং ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ইরানে এক নতুন নেতৃত্ব দেখতে চান। আগামী কয়েক মাস হয়তো সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলবে, কিন্তু এরপর তৈরি হওয়া ‘নেতৃত্বের শূন্যতা’ কে পূরণ করবে, তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল অপারেশন এপিক ফিউরির পূর্ণ সাফল্যের জন্য প্রতিদিন কাজ করছে। তবে বাস্তবতা হলো, আট মাস পরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে ভ্যান্স ও সুসি ওয়াইলসের মতো কুশলীরা এখন থেকেই চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: সিএনএন