হেগসেথের ধর্মযুদ্ধের মানসিকতা নিয়ে নতুন শঙ্কা

ইরান-মার্কিন সংঘাত যখন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং রণকৌশল বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে হোয়াইট হাউস থেকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে’র চাপ, অন্যদিকে পেন্টাগনের শীর্ষ নেতার ‘ধর্মযুদ্ধে’র মানসিকতা, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পিট হেগসেথ
সিবিএস নিউজের জনপ্রিয় ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেন, এই সামরিক অভিযানে আরও মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটতে পারে। তবে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিকই বলেছেন যে হতাহত হবেই, এই ধরনের ঘটনা প্রাণহানি ছাড়া ঘটে না।

ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হেগসেথ বলেন, আমেরিকা জেতার জন্যই লড়ছে এবং যুদ্ধের শর্তগুলো শুধু ওয়াশিংটনই নির্ধারণ করবে। তিনি হুংকার দিয়ে বলেন, আমরা জানি কখন তারা লড়াই করার ক্ষমতা হারাবে, তাদের আত্মসমর্পণ করতেই হবে।

পিট হেগসেথ
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে তেহরান। তবে ট্রাম্প এই নিয়োগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের মতে, মুজতবা একজন ‘হালকা’ নেতা এবং ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে আমেরিকার ভূমিকা থাকা উচিত। অথচ মোজতবা খামেনি ইতিমধ্যেই দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আই্‌আরজিসি) পূর্ণ সমর্থন লাভ করেছেন।

ফক্স নিউজের সাবেক সঞ্চালক ৪৫ বছর বয়সী পিট হেগসেথ এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রক। তবে সমালোচকরা তাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের অভিযোগ,  হেগসেথের শরীরে খোদাই করা ‘জেরুজালেম ক্রস’ এবং ‘ঈশ্বর এটাই চান’ ট্যাটুগুলো মধ্যযুগীয় ক্রুসেডারদের স্মারক, যা বর্তমানে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদীরা ব্যবহার করে।

পিট হেগসেথ
পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে হেগসেথকে অনেকটা বীরত্বগাথার ভঙ্গিতে ধ্বংসলীলার বর্ণনা দিতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, এটি কখনোই সমানে সমান লড়াই ছিল না... তারা যখন মাটিতে পড়ে আছে, আমরা তখন তাদের আঘাত করছি, এটাই হওয়া উচিত।

কুয়েতে ড্রোন হামলায় নিহত আমেরিকান রিজার্ভিস্টদের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে ‘ফেক নিউজ’ বলে আক্রমণ করেছেন।

এদিকে, সৌদি আরবে ইরানি হামলায় আহত আরও এক মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে, যা এই যুদ্ধে মোট আমেরিকান প্রাণহানির সংখ্যা সাতে নিয়ে গেছে। এই হতাহতের ঘটনা আমেরিকার ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি করলেও হেগসেথ পেন্টাগনকে একটি ‘ধর্মতাত্ত্বিক রণক্ষেত্রে’ পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তিনি যুদ্ধের ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিধি উপেক্ষা করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, এই যুদ্ধ কি শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য, নাকি এটি একটি ‘পবিত্র যুদ্ধে’র রূপ নিচ্ছে? ডগ প্যাগিটের মতো ধর্মযাজকরা সতর্ক করেছেন, হেগসেথ বিশ্বাস করেন ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ঈশ্বর কর্তৃক মনোনীত।


এই ধরনের চরমপন্থী চিন্তাধারা আরব মিত্রদের চটিয়ে দিতে পারে এবং ইরানকে তাদের নিজস্ব ‘জিহাদ’ বা পবিত্র যুদ্ধের যৌক্তিকতা খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। আপাতত, হেগসেথ ও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের আত্মসমর্পণের অপেক্ষায় থাকলেও, তেহরানের নতুন নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতিরোধ ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: ফোর্বস ও দ্য গার্ডিয়ার