যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে ট্রাম্প ও হেগসেথের দম্ভ গুঁড়িয়ে দিল ইরান

আমেরিকানদের কাছে আগে থেকেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইরান যুদ্ধ এখন এক নতুন এবং সংকটাপন্ন ধাপে প্রবেশ করেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর। অনেক তথ্য এখনও অজানা, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিমানটির দুই ক্রু সদস্যের পরিণতি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেয়া হলেও অন্যজনের ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত।

এর পরপরই খবর আসে যে, শুক্রবার ইরান দ্বিতীয় আরেকটি মার্কিন যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন’কে জানিয়েছেন, সেই বিমানের পাইলট কোনোমতে সেটিকে ইরানি ভূখণ্ডের বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং এরপর ইজেক্ট করলে তাকে উদ্ধার করা হয়।


এই দুটি ঘটনার অর্থ এই নয়, ইরান হঠাৎ করেই সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন হতাহতের সংখ্যাও সীমিত, এমনকি গত তিন সপ্তাহে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু যে যুদ্ধে ‘সামরিক আধিপত্যই’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শক্তি, সেখানে এই ঘটনাগুলো ‘অপ্রতিসম যুদ্ধের’ ঝুঁকিকেই স্পষ্ট করে তুলছে, যে যুদ্ধের চড়া মাশুল দিতে আমেরিকান জনগণ মোটেও প্রস্তুত নয়।

এই ঘটনাগুলো ইরানজুড়ে মার্কিন বাহিনীর ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ এবং গত এক মাস ধরে গড়ে তোলা ‘অভেদ্য শক্তির’ মেকি আবরণকেও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় বড় দাবি করা হলেও বাস্তবের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বারবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানজুড়ে ওড়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তারা তেহরানকে এমনভাবে চিত্রিত করেছিলেন যেন পাল্টা আঘাত হানার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই।

প্রায় এক মাস আগে, ৪ মার্চের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেছিলেন, এ আধিপত্য অর্জন শুধু সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমান বাহিনী ইরানি আকাশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে, এটি হবে একটি ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আকাশসীমা’ এবং ইরান এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না।


গত দুই সপ্তাহে ট্রাম্পও আকাশপথের আধিপত্য নিয়ে বেশ বড়াই করেছেন। ২৪ মার্চ তিনি বলেন, আমাদের বিমানগুলো আক্ষরিক অর্থেই তেহরান এবং তাদের দেশের অন্যান্য অংশের ওপর দিয়ে উড়ছে; তারা কিছুই করতে পারছে না। তিনি এমনকি এও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত হানলেও তারা নিরুপায় থাকবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্ট বলে আসছেন, ইরানের কোনো নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী বা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই, সেখানে কোন কিছুরই আর কোন অস্তিত্ব নেই।

গত বুধবার হোয়াইট হাউসের এক ভাষণে তিনি বলেন, তিনি ইরানের তেল স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে পারেন এবং তাদের কিছুই করার থাকবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, তাদের কোনো বিমান বিধ্বংসী সরঞ্জাম নেই। তাদের রাডার ব্যবস্থা ১০০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক শক্তি হিসেবে আমরা অপ্রতিরোধ্য।

বাস্তবে, হাজার হাজার বিমানের মধ্যে মাত্র দুটি ভূপাতিত হয়েছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে স্বীকার করেছে, কিছু বিপত্তি বা প্রাণহানি ঘটতে পারে। এমনকি ৪ মার্চের সেই ব্রিফিংয়ে হেগসেথ মেনে নিয়েছিলেন, কদাচিৎ কিছু ড্রোন সীমানা পেরিয়ে আসতে পারে বা কিছু বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনের দাবিগুলো ছিল চরমপন্থী, যেখানে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আকাশসীমা’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি ইরানকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন তাদের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো ন্যূনতম অস্ত্রও নেই।


এটি আসলে ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠদের সামরিক সাফল্য নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করার সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র। গত জুনে ইরানের পারমাণু স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। অথচ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন তা বলেনি। ঠিক নয় মাস পর, প্রশাসন আবার ইরানকে একটি ‘আসন্ন পারমাণবিক হুমকি’ হিসেবে জাহির করতে শুরু করে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার জন্য মিথ্যাভাবে ইরানকে দায়ী করেছিলেন, যা পরে তদন্তে জানা যায় সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের আঘাতেই ধ্বংস হয়েছিল। এমনকি মাত্র একদিন আগে সিএনএন রিপোর্ট করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি ছিল আকাশকুসুম অতিরঞ্জিত, আসল সত্য হলো, আইআরজিসি এখনো তাদের সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক অক্ষত রেখেছে।

এই সব কিছুর রাজনৈতিক সমস্যা হলো, সামরিক সাফল্যই ছিল এই প্রশাসনের একমাত্র বড় বিজ্ঞাপন। কিন্তু আমেরিকার সাধারণ মানুষের এই মিশনের ওপর আস্থা খুব কম। তারা মনে করে যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো তাদের কাছে স্পষ্ট নয় এবং সেই লক্ষ্যগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করা হচ্ছে। তবে সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমেরিকানরা মনে করছে, এই যুদ্ধ কোনোভাবেই এর ব্যয়ের তুলনায় সার্থক নয়।


এতকিছুর পরও হেগসেথ যুক্তি দিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমগুলো এই সামরিক অভিযানের সাফল্যকে সঠিকভাবে তুলে ধরছে না। ৪ মার্চের সেই ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলো এটাই বুঝতে পারছে না যে, আমরা কোনো স্থলসেনা ছাড়াই ইরানের আকাশপথ ও জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি।

এক মাস পর দেখা যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সেই জলপথটি এখনো একটি বড় ব্যতিক্রম হয়ে আছে। আর, ইরানের আকাশপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করার যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, তা মোটেও প্রচারণার মতো ‘নির্ভুল’ বা ‘পূর্ণাঙ্গ’ নয়।