আবারও বন্দুকধারীর হামলা থেকে বেঁচে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শনিবার রাতে ওয়াশিংটনে ‘হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের’ নৈশভোজ চলার সময় বন্দুক হামলার ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা। নৈশভোজের ভেন্যু হোটেল হিলটনের নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর এক ব্যক্তি অতর্কিত গুলি চালালে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের একটি চেকপয়েন্টে এক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের ওপর শটগান দিয়ে গুলি চালায় ওই হামলাকারী। তবে, নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তাকে জাপ্টে ধরে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। পরে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক জরুরি ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, আক্রান্ত ওই অফিসার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের কারণে বেঁচে গেছেন এবং তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত। সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যান্থনি গুগলিয়েলমিও নিশ্চিত করেছেন, ওই অফিসারকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
হামলার লক্ষ্যবস্তু ট্রাম্প ছিলেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না হলেও ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছেন, তিনি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্প তিনবার প্রাণঘাতী হামলা থেকে বেঁচে গেলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্রটিই ফুটিয়ে তুলছে।
হামলাকারীকে ‘লোন উলফ’ আখ্যা দিলেন ট্রাম্প
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তিকে ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা কোল টমাস অ্যালেন (৩১) হিসেবে শনাক্ত করেছে। অ্যালেনের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের নিকটবর্তী টরেন্সের একজন শিক্ষক।
ওয়াশিংটনের অন্তর্বর্তী পুলিশ প্রধান জেফরি ক্যারল জানান, হামলাকারীর কাছে একটি শটগান, একটি হ্যান্ডগান এবং একাধিক ছুরি ছিল। মানসিক মূল্যায়নের জন্য তাকে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ওই ব্যক্তি ওই হোয়াইট হিলটন হোটেলেই অতিথি হিসেবে অবস্থান করছিলেন।
রাত ৮:৩৫ মিনিটের দিকে ঘটা এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ওই সময়ে হোটেলের বিশাল বলরুমে প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। হোয়াইট হাউসের এই বার্ষিক নৈশভোজটি ওয়াশিংটনের অন্যতম হাই-প্রোফাইল সামাজিক অনুষ্ঠান।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মাঝেও হামলাকারী কীভাবে শটগান নিয়ে হোটেলের ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হলেন, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।
হামলার পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে মধ্যরাতে বিরল এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তার পাশে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকেও সেখানে দেখা গেলেও ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে এই হোয়াইট হিলটন হোটেলের বাইরেই প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সিসিটিভি ফুটেজ শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখা যায় হামলাকারী দ্রুত দৌড়ে নিরাপত্তা চৌকি পার হওয়ার চেষ্টা করছেন।
ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছিল
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মঞ্চে একজনের সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ বলরুমের পেছনের দিকে গুলির শব্দে পুরো কক্ষে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত ২৬০০ অতিথির মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং অনেকেই টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন। সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা অস্ত্র উঁচিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের দেহ দিয়ে আড়াল করে ফেলেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাইফেল হাতে মঞ্চে অবস্থান নেন এবং ট্রাম্প, মেলানিয়া ও জেডি ভ্যান্সকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। অনুষ্ঠানটি বাতিল হওয়ার পরও ট্রাম্প প্রায় এক ঘণ্টা মঞ্চের পেছনে অবস্থান করেছিলেন। রয়টার্সকে একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প অনুষ্ঠান ছেড়ে যেতে চাননি। তার এই জেদ ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে প্রথম হামলার সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যেখানে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে নিজের অকুতোভয় মানসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাটলারে ২০ বছর বয়সী এক বন্দুকধারীর গুলিতে ট্রাম্পের কান জখম হয়েছিল। তার মাত্র দুই মাস পর ফ্লোরিডার গলফ ক্লাবেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, যে ঘটনায় হামলাকারীকে গত ফেব্রুয়ারিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স