কাতারের রাজপরিবারের কাছ থেকে ‘উপহার’ হিসেবে পাওয়া এবং পরে মার্কিন জনগণের টাকায় খোলনলচে বদলে ফেলা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজে অবশেষে প্রথমবার রাজকীয় উড়াল দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার নতুন সাজে সজ্জিত এই বিলাসবহুল প্লেনে চড়ে উত্তর ডাকোটা যাওয়ার পথে ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই এটিকে ‘এ যাবৎকালে নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক বিমান’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন!
যৌথ ঘাঁটি অ্যান্ড্রুজ থেকে প্রায় ১৪ বছর পুরোনো এই রাজকীয় জেটে ওঠার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বেশ রসিয়েই বলেন, আমি বোয়িং কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সবচেয়ে সেরা প্লেন কোনটি? তারা বলেছে এটিই এ যাবৎকালের নির্মিত সেরা বিমান আর আপনি এটিতে ওড়ার বিশেষাধিকার পেতে যাচ্ছেন; আমিও এই বিশেষাধিকার উপভোগ করছি।

তবে ট্রাম্পের এই বিলাসবহুল সফরে জল ঢেলে দিতে ছাড়েননি তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করা এবিসি নিউজের প্রধান হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা মেরি ব্রুস। তিনি ট্রাম্পের মুখের ওপরই প্রশ্ন তোলেন, উড়োজাহাজটি সম্ভবত ট্রাম্প শুধু একাই ব্যবহার করবেন, সেটির পেছনে মার্কিন জনগণের ট্যাক্সের টাকা ওড়ানো কতটা যৌক্তিক? ট্রাম্প অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নন। চটজলদি জবাবে তিনি বলেন, দেখুন, আমরা যদি অন্য কোনো উপায়ে নতুন প্লেন তৈরি করতাম, তবে যে খরচ হতো তার তুলনায় এই সংস্কারের খরচ কিছুই না!

বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই আকাশছোঁয়া উপহার পাওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নীতিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কারণ মার্কিন ইতিহাসে এমন উপহার পাওয়ার ঘটনা একপ্রকার নজিরবিহীন। তবে সমালোচকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বুধবার কাতার সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সত্যি বলতে, আমরা এমন প্লেন বানাতে পারতাম না কারণ এত টাকা ওড়াতে আমরা রাজি হতাম না। তারা (কাতার) দেদারসে ডলার খরচ করেছে। আমাদের আগের এয়ার ফোর্স ওয়ানটির বয়স ছিল ৩৫-৩৬ বছর, যা নতুন প্লেনের পাশে পার্ক করে রাখলে দেশের মান-সম্মান থাকত না। তাই এটি নিয়ে আমরা বেশ গর্বিত।

প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার খাতিরে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে টেক্সাসে মার্কিন বিমান বাহিনী এই উপহারের প্লেনটির আধুনিকায়নের কাজ করছিল, যার বাজেট ধরা হয়েছিল ৪০ কোটি ডলারের কম। তবে এই গল্পের সবচেয়ে রসালো অংশটি হলো, হোয়াইট হাউজের প্রস্তাবিত ব্যবস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই এই রাজকীয় বিমানের মালিকানা সরাসরি হস্তান্তর করা হবে ‘ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি ফাউন্ডেশন’-এর কাছে! এদিকে বোয়িং কোম্পানি পরবর্তী প্রজন্মের যে আসল ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বহর তৈরি করছে, তা সরবরাহ করা হবে ২০২৮ সালের দিকে, ঠিক যখন ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ ছাড়ার সময় হবে। অর্থাৎ, কাতারী উপহারের পুরো মজা একচেটিয়া লুটে নিচ্ছেন ট্রাম্প!

ভেতরের চোখধাঁধানো রূপ: এবিসির সংবাদদাতা মেরি ব্রুসের বর্ণনা অনুযায়ী, বিমানের ভেতরটা যেন এক টুকরো রাজপ্রাসাদ। হালকা বেইজ ও ট্যান রঙের বিন্যাসের সাথে রয়েছে সোনালী আভা ও গাঢ় কাঠের নিখুঁত কারুকাজ। কার্পেটেও রয়েছে ট্যান ও ক্রিম রঙের আভিজাত্যের স্ট্রাইপ। আর সাংবাদিকদের জন্য রাখা প্রেস ক্যাবিনে রয়েছে ১৪টি শোয়া যায় এমন ‘লাই-ফ্ল্যাট পড’।
যেখানে কোমরের আরামের জন্য লাম্বার সাপোর্ট ও ম্যাসাজ ফাংশনযুক্ত বড় বড় ট্যান লেদারের রাজকীয় আসন বসানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি আসনের পেছনে থাকা টেলিভিশনে স্ক্রিনে সারাক্ষণ চলছিল খোদ হোয়াইট হাউজের পছন্দ করা সব চ্যানেল। সব মিলিয়ে, বিতর্ক যতই থাকুক, ট্রাম্প যে ডানা মেলেছেন এক পরম স্বর্গীয় সুখেই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
