হোয়াইট হাউসের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত বৃহস্পতিবার যখন তাঁর দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের খবর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলেন, তখন হয়তো ভাবেননি যে সাত সমুদ্র তেরো নদী পারের ইরান থেকে এমন এক ‘শুভেচ্ছা’ আসবে যা মুহূর্তেই খুশির আমেজকে বিষাদে রূপ দেবে।
নবজাতকের গালের আদুরে চুম্বনে তেহরান মনে করিয়ে দিল মিনাবের সেই বীভৎস রক্তপাতের কথা, যেখানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঝরে গিয়েছিল ১৬৮টি প্রাণ।
২৮ বছর বয়সী লেভিট তাঁর নবজাতক কন্যা ভিভিয়ান ওরফে ‘ভিভি’-র সাথে একটি স্নিগ্ধ ছবি এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ১ মে ভিভি আমাদের পরিবারে এসেছে। আমরা আমাদের এই নতুন আনন্দের বুদবুদে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি।
কিন্তু এই পোস্টে পানি ঢেলে দিয়ে আর্মেনিয়াস্থ ইরানি দূতাবাস থেকে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করা হয়। অভিনন্দন জানিয়েই তেহরান লেভিটকে তীব্র আক্রমণ করে বলে, অভিনন্দন। শিশুরা নিষ্পাপ ও আদুরে। মিনাবের স্কুলে আপনার বস (ট্রাম্প) যে ১৬৮ শিশুকে হত্যা করেছেন এবং আপনি যেটির সাফাই গেয়েছেন, তারাও শিশু ছিল। নিজের শিশুকে চুমু খাওয়ার সময় ওই হতভাগ্য মায়েদের কথা একবার ভাববেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার দিন মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক স্কুলে আঘাত হানে মার্কিন ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এই হামলায় ৭৩ জন ছেলে ও ৪৭ জন মেয়ে শিশুসহ মোট ১৬৮ জন নিহত হয়। এছাড়া প্রাণ হারান ২৬ জন শিক্ষক এবং স্কুলের পাশের ক্লিনিকের কর্মীরাও।
এই ঘটনার পর লেভিট হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না। এই কাজ শুধু ইরানি শাসনব্যবস্থার। অথচ নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তেই দেখা গেছে, নিশানা নির্ধারণে ভুলের কারণে ‘টমাহক’ মিসাইলটি সরাসরি ওই স্কুলে গিয়ে পড়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম থেকেই এই হামলার দায় ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছেন। গত ৭ মার্চ তিনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই বলেন, তাঁর ‘ব্যক্তিগত অভিমত’ অনুযায়ী ইরানই এই কাজ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, ইরানের অস্ত্রাগারে কোনো টমাহক মিসাইল নেই, যা শুধু আমেরিকারই বিশেষ সমরাস্ত্র।
পরবর্তীতে স্কুলে হামলার ভিডিও সামনে এলে ট্রাম্প বলেন, আমি এটি দেখিনি। এমনকি নিজের দেশের সামরিক বাহিনীর তদন্ত রিপোর্ট নিয়েও তিনি ‘কিছুই জানেন না’ বলে পাশ কাটিয়ে যান।
লেভিট বর্তমানে তাঁর মাতৃত্বকালীন ছুটি উপভোগ করছেন, তবে ইরানের এই কড়া জবাব তাঁকে মনে করিয়ে দিল যে কূটনৈতিক লড়াইয়ে ‘ব্যক্তিগত সুখ’ অনেক সময় বৈশ্বিক রাজনীতির নিষ্ঠুর দাবার ছক হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে ওয়াশিংটনের বিলাসবহুল নার্সারিতে ভিভিয়ানের আগমনে উৎসবের রোশনাই, অন্যদিকে মিনাবের ধুলোবালিতে মিশে যাওয়া সেই ১৬৮ জন শিশুর মায়েরা আজও বিচারের অপেক্ষায়।
বিশ্ব মা দিবসে মাতৃত্বের এই আবেগঘন মুহূর্তকে ইরান যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ঢাল বানালো, তা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস