মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর আরও কঠোর শর্ত আরোপের দাবি জানিয়েছেন। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।
একই সাথে ইসরাইলি দৈনিক ‘ইসরায়েল হায়োম’-এর একটি আলাদা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানকে অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে গত এক সপ্তাহে কাতারের বেশ কিছু তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি কিছু জাহাজকে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি পাহারা দিয়ে নিয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ইরানের সাথে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর খসড়া চুক্তি নিয়ে হওয়া বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধি দলকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরান কর্তৃক মজুতকৃত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার কাছে হস্তান্তরের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গত বছরের জুন মাসে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সাইটগুলো থেকে ইরান প্রায় ১০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে। ট্রাম্প এখন সেই পরমাণু সামগ্রী সম্পূর্ণভাবে জব্দ করার নিশ্চয়তা চান।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ব্যঙ্গাত্মক সুরে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রস্তাবের জবাব দিতে ইরানের প্রায় তিন দিন সময় লাগবে, কারণ তাদের নেতারা এখন আক্ষরিক অর্থেই গুহায় লুকিয়ে আছেন এবং যোগাযোগের জন্য কোনো ইমেল ব্যবহার করছেন না।
এদিকে ফক্স নিউজে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সাথে চুক্তি ‘ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই শেষ হবে, অন্যথায় আমেরিকা আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাবে। চুক্তি সইয়ে তাঁর কোনো তাড়াহুড়ো নেই উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তাড়াহুড়ো করলে ভালো চুক্তি করা যায় না। তবে আমি চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী, কারণ চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই আমরা হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দিতে পারব। আমার একমাত্র গ্যারান্টি হলো, ইরানের কাছে কোনো পরমাণু অস্ত্র থাকবে না এবং ওরাও এই শর্তে রাজি হয়েছে।
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, আগে চুক্তিতে লেখা ছিল ‘ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না’, কিন্তু তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে সেখানে যুক্ত করেছেন, ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র ‘তৈরি বা ক্রয়’ করতে পারবে না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে তীব্র বিমান হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা জবাবে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে মিসাইল হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ সৃষ্টি করে, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ স্থবির করে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছালেও, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালীতে আবারও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মুখোমুখি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ট্রাম্পের এই নতুন শর্ত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে কাতারি ট্যাংকারের গোপন পারাপার মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আবারও এক জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিল।