গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্তম্ভিত গোটা আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ-নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে অশ্রুসজল ভালোবাসায় প্রায় তিন হাজার নিহত মানুষকে স্মরণ করল আমেরিকানরা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অপহৃত চারটি বিমান নিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভেনিয়ার একটি মাঠে যে বিভীষিকাময় হামলা চালানো হয়েছিল, তার সেই ক্ষত ও প্রতিক্রিয়া আজও বয়ে বেড়াচ্ছে দেশটি।

১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার ২৫তম বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে ৯/১১ মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলের পাশে নিউইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন ছবি: সংগৃতীত
নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের গ্রাউন্ড জিরোতে আয়োজিত মূল স্মরণসভায় নিহতদের স্বজনেরা তাঁদের প্রিয়জনদের ছবি হাতে নিয়ে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সাবেক চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উপস্থিত ছিলেন। ঠিক সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে, যে সময়ে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হেনেছিল, সেখানেই এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সিটিতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার ২৫তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানের দিন ৯/১১ মেমোরিয়ালের ভেতরে অবস্থিত ভেটেরানস মেমোরিয়ালে সমবেত মানুষরা ছবি: সংগৃহীত।
এরপরই শুরু হয় ২০০১ সালের ৯/১১ হামলায় নিহত ২,৯৭৭ জন এবং ১৯৯৩ সালের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বোমা হামলায় নিহত ৬ জনের নাম করুণ সুরে একে একে পাঠ করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সময়ের বহমানতার স্মারক হিসেবে অনেক পাঠক ছিলেন তৎকালীন সময়ে জন্ম না নেয়া শিশু, যারা কোনোদিন দেখেনি এই হামলায় হারিয়ে যাওয়া তাদের আপনজনদের।

১১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে পেন্টাগনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ২৫তম বার্ষিকীর এক স্মরণানুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তব্য রাখছেন ছবি: সংগৃহীত
পরবর্তীতে বাকি তিনটি বিমান দুর্ঘটনা ও দুটি টাওয়ার ধসে পড়ার মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করে আরও কয়েকবার নীরবতা পালন করা হয়। তবে এবারই প্রথমবারের মতো, হামলার পর দীর্ঘ মাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিষাক্ত ধূলিকণার প্রভাবে সৃষ্ট ব্যাধিতে পরবর্তীতে মারা যাওয়া হাজার হাজার মানুষের স্মরণে সপ্তমবারের মতো এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীর স্মৃতিফলক অনুষ্ঠানে সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানি ছবি: সংগৃহীত
ভার্জিনিয়ার আরলিংটনে ভারী বৃষ্টির মধ্যেই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা পেন্টাগনের পশ্চিম পাশে একটি বিশাল মার্কিন পতাকা উত্তোলন করেন, যেখানে অপহৃত ফ্লাইট-৭৭ আঘাত হেনে ১৮৪ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেখানে ভাষণ প্রদান করবেন। অন্যদিকে পেনসিলভেনিয়ার শ্যাঙ্কসভিলেও সমবেত হন শোকাতুর স্বজনেরা, যেখানে ওয়াশিংটন অভিমুখী অপহৃত ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৩’-এর বীর যাত্রীরা সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করায় বিমানটি আছড়ে পড়েছিল।

US 9-11 Anniversary 07
এই হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই বদলে দেয়নি; বরং পুরো একটি প্রজন্মকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে উদ্ধারকর্মী ও নিহতদের পরিবারগুলোর কাছে এই দিনটি শুধুই হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতি ও সিকি শতাব্দী ধরে বয়ে বেড়ানো এক নিরবচ্ছিন্ন হৃদয়দাহের নাম।

US 9-11 Anniversary 08
ক্যানটর ফিটজেরাল্ড প্রতিষ্ঠানে বন্ধুকে হারানো ও নিজে বেঁচে যাওয়া গ্রেগরি ক্যারাফেলোর মতে, সবাইকে অনুধাবন করতে হবে এটি পরিবারগুলোর জন্য কতটা ভয়াবহ দিন ছিল। যারা সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন তারা কোনো যোদ্ধা ছিলেন না; তারা ছিলেন আপনার বা আমার মতো সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিনের মতো সেদিনও জীবিকার তাগিদে শুধু কাজে গিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স