জাতিসংঘে তীব্র অনাস্থা ও অবিশ্বাসের মুখোমুখি ট্রাম্প

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া গেলো বছরের ভাষণে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা তেহরানের সব সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’ করে দিয়েছে এবং ইসরাইল-ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে পেরেছেন।

তবে এক বছর পর আগামী মঙ্গলবারে সেই একই বিশ্বমঞ্চে ফিরে ট্রাম্পকে এক গভীর সংশয় ও চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ইরান ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যকার গত ছয় মাসের যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীলতা এবং পারমাণবিক হুমকির অব্যাহত উপস্থিতি ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

Trump 01
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনের চাপ:
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় বড় ধসের কারণে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিষয়ক সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, একজন প্রেসিডেন্ট যখন কোনো যুদ্ধের সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত পরিণতি অনুধাবন না করে হুট করে সিদ্ধান্ত নেন, তার ফল কী হতে পারে, আমরা এখন সেটাই দেখছি। ট্রাম্প যে যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা এখন এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে, যা একই সাথে পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও খালি করে দিচ্ছে।

Trump 03
লোহিত সাগর ও হুথি সংকট:
কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে ইয়েমেনের হুথি বাহিনী সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে কোণঠাসা করায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে ইরানের হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক জলপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশনে জড়াতে সৌদি আরবের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এই অনীহা এবং পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের আপত্তি সত্ত্বেও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে মিত্র দেশগুলোর মনে গভীর সংশয়ের সৃষ্টি করেছে।

Iran War 07
পারমাণবিক দাবি বনাম ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা:
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান থেকে আসা সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পুনরায় বিমান হামলা চালিয়ে একাধিক শীর্ষ ইরানি নেতাকে হত্যা করে। তবে ইরান সেই ধাক্কা সামলে উঠে তার কাছে থাকা উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুদ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়ে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা জাহির করেছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন ট্রাম্প একাই সাহসিকতার সাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মুখোমুখি হয়েছেন এবং সব লক্ষ্য অর্জন করেছেন। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও কোণঠাসা করতে ইরান এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত জিইয়ে রাখবে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক জটিল দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে।