জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের অসত্য ও অতিরঞ্জিত বয়ান!

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মহাআয়োজনে বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাফল্যের ঝুলি উজাড় করতে গিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব দাবির পশরা সাজালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অস্ত্রভাণ্ডারের জোগান থেকে শুরু করে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ, মাদক জব্দ কিংবা বৈশ্বিক বিনিয়োগ, একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যুতে তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বিশদ তথ্যানুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে, ট্রাম্পের পেশ করা চকচকে পরিসংখ্যানের অধিকাংশই তার দ্বিতীয় মেয়াদে বলা পুরনো মিথ্যাচারের পুনরাবৃত্তি মাত্র।

Trump UNGA 02
অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হাঁক ছেড়ে দাবি করেন, মার্কিন বাহিনীর কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বহু গুণ বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং ইতিহাসে কখনো না দেখা গতিতে অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও খোদ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য ট্রাম্পের এই বুলি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইরানের সাথে ট্রাম্পের যুদ্ধের কারণে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর অস্ত্রাগার এখন মারাত্মকভাবে খালি। টমাহক ক্রুজ মিসাইল, প্যাট্রিয়ট ও থাড মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি মেটাতে সামরিক ঠিকাদারদের বছরের পর বছর লেগে যাবে, যার ফলে ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার সংকট চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।

তেল ও মাদক চোরাচালান ইস্যুতেও ট্রাম্পের বয়ান বাস্তবতার ধোপে টেকেনি। ভেনেজুয়েলার সাথে সাম্প্রতিক তেল চুক্তির সূত্র ধরে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা যৌথভাবে বিশ্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি তেলের মালিক! অথচ বাস্তব তথ্য বলছে, ভেনেজুয়েলার আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল সংরক্ষিত তেলের শতবর্ষী স্বত্ব মিললেও, মার্কিন ও ভেনেজুয়েলান তেল একসাথে করলেও তা বিশ্বের মোট ১.৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল রিজার্ভের বড়জোড় ২২ শতাংশ মাত্র।

Trump UNGA 03
তদুপরি ধ্বংসপ্রায় অবকাঠামোর কারণে সেখান থেকে দ্রুত তেল উত্তোলন কাল্পনিক বিষয়। একইভাবে সমুদ্রপথে আসা ৯৭ শতাংশ মাদক ধ্বংস করার দাবিকেও বিশেষজ্ঞরা মনগড়া বলেছেন, কারণ পাচারের প্রকৃত পরিমাণের কোনো প্রামাণ্য হিসাব রাখা অসম্ভব।

অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ঢোল পেটাতে গিয়েও নিজের ঝুলিকে কাল্পনিক শক্তিতে ভারী করেছেন প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০ লাখ বেসরকারি চাকরি সৃষ্টির দাবি করলেও সরকারি ডেটা বলছে সংখ্যাটি ৮ লাখ ৭ হাজারের কাছাকাছি, যা ঐতিহাসিক বিচারে অত্যন্ত সাধারণ।

বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দাবিটিও বেপরোয়াভাবে অতিরঞ্জিত; কারণ হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও এই অঙ্ক ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে জো বাইডেনের আমলের পুরোনো প্রস্তাবও ঢুকে আছে। এমনকি ‘আটটি যুদ্ধ থামানোর’ মেডেল নিজের বুকে সাঁটলেও, বাস্তবে ট্রাম্প এমন শান্তির কৃতিত্ব নিচ্ছেন যেখানে কোনো যুদ্ধই ছিল না, অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রক্তাক্ত যুদ্ধটি সরাসরি তাঁর নিজের হাতেই শুরু হয়েছে।