ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐতিহাসিক চতুর্থ মেয়াদের জয় নিশ্চিত করেছেন বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তবে, রোববার অনুষ্ঠিত এই দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের চরম হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফলাফলকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন কট্টর ডানপন্থী সেনেটর ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো। কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইরের ছেলে ফ্ল্যাভিও তাঁর পিতার পথ অনুসরণ করেই পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং নির্বাচন বাতিলের আনুষ্ঠানিক আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
ব্রাজিলিয়ান নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, লুলা ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্ল্যাভিও বলসোনারোর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল চার মিলিয়নেরও বেশি। তা সত্ত্বেও সাংবাদিক সম্মেলনে ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে পরিস্থিতিতে পুরো বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে, তাতে নির্বাচনের এই ফলাফল মেনে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মূলত, নির্বাচনের দিন লুলার নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক গণপরিবহন জটিলতার অভিযোগে শেষ মুহূর্তে ভোটের সময়সীমা দুই ঘণ্টা বৃদ্ধি করেন। এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেই আইনি লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করতে চাচ্ছেন ফ্ল্যাভিও।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চার মিলিয়নেরও বেশি ভোটের বিশাল ব্যবধানের কারণে ফ্ল্যাভিওর এই ফল বাতিলের আবেদন সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাছাড়া, ফ্ল্যাভিও নিজের দলও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বর্ষণের অজুহাতে ভোটের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিল, যা তাঁর বর্তমান আইনি ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তা সত্ত্বেও, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় টান পড়া একটি দেশে ফ্ল্যাভিওর এই পরাজয় অস্বীকারের ঘোষণা ফের বড় ধরনের বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর জাইর বোলসোনারোর সমর্থকরা সরকারি ভবনে হামলা চালিয়ে দেশে এক ভয়াবহ গণতান্ত্রিক সংকট তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত হয়ে জাইর বলসোনারো ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
অন্যদিকে, জরিপ ও পূর্ববর্তী সব সমীকরণ ভুল প্রমাণ করে লুলার এই অভাবনীয় জয় লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ডানপন্থী রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ধারায় এক বড় ধাক্কা দিয়েছে। একই সাথে, মার্কিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি এক বড় হতাশাজনক খবর, কারণ তাদের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বোলসোনারো পরিবারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার সুক্ষ্ম চেষ্টা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও এই ফলাফলের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে; টোকিও স্টক এক্সচেঞ্জে ব্রাজিলের বোভেসপা সূচক ট্র্যাকিং ফান্ড এক লাফে প্রায় ১৫ শতাংশ পড়ে গেছে।
সব বাঁধা পেরিয়ে জয়ী হলেও চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে অপেক্ষা করছে কণ্টকাকীর্ণ পথ। দেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এবং রেকর্ড কম বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরে লুলা প্রচার চালালেও, আগামী দিনে তাঁকে কাজ করতে হবে বোলসোনারোপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বৈরী কংগ্রেসের সঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী উত্তাপ কমলেও লুলার জন্য সামনের দিনগুলোতে দেশ পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স