মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নিজের স্বভাবসুলভ অতি বেপরোয়া এবং খামখেয়ালি মন্তব্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের জনপ্রিয়তা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যদি তাঁর ওপর কোনো কারণে বিরক্ত হয়ে যায়, তবে তিনি সোজা ইসরাইলে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতেও দ্বিধা করবেন না!
শুধু এখানেই থেমে থাকেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প একই সাথে বোমা ফটিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সাহায্য একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানা যায়, মার্কিন নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সটান দাবি করেন, ইসরাইলের মতো ধনবান দেশের আর মার্কিন পকেটের এই বিপুল পরিমাণ সামরিক অনুদানের প্রয়োজনই নেই। তবে ফ্রিতে অর্থ সাহায্য বন্ধ হলেও তাদের কাছে মোটা অঙ্কের মার্কিন অস্ত্র বিক্রি ঠিকই চালু থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ইসরাইলকে সামরিক সাহায্য বন্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপকেও কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ট্রাম্প। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো সরব রাজনীতিকরা যখন ইসরাইলনীতি নিয়ে ক্রমাগত তোপ দাগছেন, তখন ট্রাম্প সোজা সাপটা বলে বসেন, তাদের যেখানে সাহায্যের দরকারই নেই, সেখানে এল-সাইয়েদের মতো উন্মাদদের কাছ থেকে আমরা কেন খামোখা গালি খাব? এটা একটা বাজে রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়া আর কিছুই না।
এখানেই শেষ নয়, ট্রাম্প উল্টো দাবি তুলেছেন, এই অনুদান কমানোর বুদ্ধি নাকি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই তাঁকে দিয়েছেন! ট্রাম্পের ভাষ্য, আমরা প্রতি বছর তাদের ৪০০ কোটি ডলার সমপরিমাণের সামরিক সরঞ্জাম ও নগদ টাকা দিই। অথচ তাদের এর কোনো দরকারই নেই। নেতানিয়াহু নিজেই এ নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন।
যদিও এর আগে নেতানিয়াহু আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প রাতারাতি চলতি বছরের শেষেই সাহায্য বন্ধের যে ডেডলাইন ঝুলিয়ে দিয়েছেন, তাতে চরম আতঙ্কে পড়ে গেছেন ইসরাইলের কর্মকর্তারা।
এদিকে ওয়াশিংটন থেকে এই আকস্মিক ঘোষণা আসার পরপরই তেল আবিবের রাজনীতিতে শুরু হয়ে গেছে তীব্র তোলপাড়। ইসরাইলি বিরোধী দলের নেতারা মার্কিন সহায়তায় এই টান পড়ার জন্য সরাসরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর সব ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-ডানপন্থী নেতা গাদি আইজেনকট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং নাগরিকেরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানছেন যে কৌশলগত সম্পর্কের বিন্যাস বদলে যাচ্ছে! এই ঘটনা প্রমাণ করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে কতটা বিপজ্জনক। আমরা আর তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারি না, তাঁকে এখনই গদি থেকে সরাতে হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলানও নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী সাহায্য বাড়ানোর জন্য লড়াই করতেন, অথচ নেতানিয়াহুর ভুলের খেসারতে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়ে গেল।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের বৈদেশিক সামরিক সহায়তার সিংহভাগ অনুদান হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছিল ইসরাইল, যা দিয়ে এফ-৩৫ এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কিনত তারা। এছাড়া যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত ৫০ কোটি ডলারও দেওয়া হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ডামাডোলের মাঝে ট্রাম্পের এই আকস্মিক নীতিবদল এখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিব- দুই দেশেই নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে।