যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে বিরোধীদল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের এই বিশাল নীল ঝড় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শাসনের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যান বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন আইনসভার দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের এই নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে ট্রাম্পের মেয়াদকালের শেষ দুই বছরে তাঁর আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের স্থবিরতা ও কঠোর তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে ওয়াশিংটনকে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও শাসনের ওপর এক ধরনের গণভোট ছিল এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বিতর্কিত শুল্কনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মূল্য আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পারদ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
এসব ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন ভোটাররা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে তাদের রায় দিয়েছেন। নির্বাচনে জয়ের ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন ট্রাম্পের যে কোনো বিলে ভেটো দেয়ার এবং তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত চালানোর ক্ষমতা অর্জন করলো। পাশাপাশি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কিংবা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগে ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়লো। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এখন ব্যস্ত পরবর্তী কৌশল নির্ধারণে।

এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং ১০০ আসনবিশিষ্ট সেনেটের ৩৫টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের সীমা পার করে ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যেই ২২০টি আসনে জয় সুনিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, সিনেটে ৭টি আসন ছিনিয়ে নিয়ে মোট ৫৩টি আসনে জয় নিশ্চিত করে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, উত্তর ক্যারোলিনা ও ওহাইওর মতো ঐতিহাসিক রিপাবলিকান দুর্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। এমনকি জর্জিয়া, ওহাইও, আইওওয়া এবং টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে গভর্নর পদেও রিপাবলিকানদের হারিয়ে জয় তুলে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।

নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইন্ডিয়ানার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে। তিন মেয়াদের প্রভাবশালী রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে হারিয়ে সেখানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেডি ফোর্ড। দুই বছর আগে যে আসনে ট্রাম্প প্রায় ১৭ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন, সেখানে ফোর্ডের বিজয় প্রমাণ করে, এবার শুধু ‘সুইং স্টেট’ নয়, লাল দুর্গ হিসেবে পরিচিত শক্ত রিপাবলিকান এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাটরা আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
একইভাবে মেইন অঙ্গরাজ্যে ছয় মেয়াদের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সেনেটর সুসান কলিন্সকে হারিয়ে জয় নিশ্চিত করেছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন, যা সেনেট দখলের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি রিপাবলিকান ক্যাপের ছবি পোস্ট করেন, যাতে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘ভিটো’।

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ডেমোক্র্যাটদের যে কোনো বিল বা উদ্যোগকে বাধা দিতে তিনি তাঁর প্রেসিডেন্টের বিশেষ ‘ভিটো ক্ষমতা’ প্রয়োগ করবেন। তবে অন্যদিকে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প পরাজয়ের দায় কিছুটা এড়িয়ে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা তাদের প্রচারণায় বেশ কাজ দেখিয়েছে এবং স্থানীয় রিপাবলিকান প্রার্থীদের দুর্বলতার কারণেই অনেক আসন হাতছাড়া হয়েছে।
মার্কিন আইনসভায় এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর ওয়াশিংটনে এক নতুন রাজনৈতিক সচ্ছলতা ও জবাবদিহিতার অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
