পাকিস্তানে নতুন সরকারের সামনে বড় যে চ্যালেঞ্জ

পাকিস্তানে নির্বাচনের ১১ দিন পার হলেও এখনো কোনো সরকার গঠিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছোট বড় বেশ কয়েকটি দল মিলে জোট সরকারের পথে হাঁটছে দেশটি। তবে ক্ষমতায় যেই বসুক, অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়তে হবে নতুন সরকারকে।

পাকিস্তানে নতুন সরকার গঠনে আলোচনা-সমঝোতার চেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আপাতত অর্থনীতি নিয়ে তেমন উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে যে সরকারই পাকিস্তানের হাল ধরুক না কেন, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা সামাল দেয়া তাদের জন্য কঠিন হবে৷

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে বর্তমানে দেশটির বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে দুই মাসের চাহিদা মেটানোর মতো পণ্যসামগ্রী আমদানি করা সম্ভব। প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় এই রিজার্ভ অনেক কম।

আগামী দুমাসে পাকিস্তানকে আরও প্রায় ১০০ কোটি ডলার বন্ডের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে তাদের রিজার্ভ কমবে। এরই মধ্যে আইএমএফের ঋণের ৭০ কোটি ডলার তাদের রিজার্ভে যুক্ত হওয়ার কথা। এদিকে, পাকিস্তানের ঋণ-জিডিপির অনুপাত ইতিমধ্যে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

আইএমএফসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটির রাজস্ব আয়ের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হবে।  করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ একাধিক সংকটের কারণে বিশ্বের অনেক প্রান্তে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে৷

কিন্তু পাকিস্তানের মতো শোচনীয় পরিস্থিতি খুব বেশি দেশে দেখা যাচ্ছে না। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৩০ শতাংশেরও বেশি৷ আর সরকারি হিসেবেই প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্রসীমার নীচে৷ পাকিস্তানি রুপির আরও দরপতন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি আইএমএফ এক প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি অর্থবছরে প্রতি ডলারের দাম ৩০৫ রুপিতে উঠে যেতে পারে। যা আগামী অর্থবছরে ৩৩১ রুপি পর্যন্ত উঠতে পারে। এখন ১ ডলারে মিলছে ২৭৯ পাকিস্তানি রুপি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কমার পর মার্কিন ডলারের সাথে পাকিস্তানের মুদ্রার বিনিময় মূল্যের অস্বাভাবিক ওঠানামার কারণে আমদানির সমস্যা রয়েছে৷

তার উপর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে৷ আপাতত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জরুরি ঋণ সম্বল করে পাকিস্তান কোনোরকমে টিকে আছে৷ অন্যান্য যে কোনো নীতির মতো অর্থনীতির প্রশ্নেও সামরিক বাহিনীর সম্মতি ছাড়া নতুন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এক পা ফেলা সম্ভব হবে না৷

তার উপর একদিকে মরিয়া জনগণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দাতারা সংস্কারের চাপ সামলে বাজারের আস্থা অর্জন করাও পাকিস্তানের নতুন সরকারের জন্য কঠিন কাজ হবে৷ প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে উত্তেজনা ও স্থিতিশীলতার অভাবের কারণে পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ এমনিতেই কমে চলেছে৷

শুধু চীনের কৌশলগত সহায়তার উপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। গেল জুনে আইএমএফ পাকিস্তানকে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ দিলেও দেশটিকে কিছু অপ্রিয় সংস্কার চালাতে বাধ্য করে৷ ১৯৫৮ সাল থেকে এই নিয়ে ২৩ বার পাকিস্তানকে এমন সহায়তা দিতে হয়েছে।

সর্বশেষ সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে সরকারকে বিদ্যুতের উপর বাড়তি কর চাপাতে হয়েছে, ভরতুকি কমাতে হয়েছে৷ বিপুল বিদ্যুৎ ঘাটতির মাঝে এমন পদক্ষেপ ব্যাপক জনরোষ সৃষ্টি করেছে৷ নতুন সরকার আরও ঋণ চাইলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অপ্রিয় সংস্কার চালাতে বাধ্য হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷ বিশেষ করে কর ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবকাঠামো শক্তিশালী করে দেশের মধ্যে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর জন্য চাপ বাড়ছে৷

কঠিন পরিস্থিতিতে করের বাড়তি বোঝা পাকিস্তানের অনেক মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে৷ বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা এমন চাপ প্রতিরোধের চেষ্টা করতে পারেন৷ পাকিস্তানের একাধিক সরকার এতকাল এমন সব অপ্রিয় পদক্ষেপ এড়িয়ে গেছে৷ নতুন সরকারের পক্ষে সেটা আর সম্ভব নাও হতে পারে৷