ভারতে কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তরপ্রদেশের রায়বরেলি ও আমেথি আসন। কিন্তু গত নির্বাচনে আমেথিতে রাহুল গান্ধীর ভরাডুবির পর দলে নানা প্রশ্ন ওঠে। তাই এবার নির্বাচনে আমেথি থেকে সরেই যান তিনি।
সেখানে কংগ্রেসের প্রার্থী করা হয় প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত কিশোরী লাল শর্মাকে। চার দশকের বেশি সময় ধরে গান্ধী পরিবারের বিশ্বস্ত অনুগামী কিশোরী লাল প্রথমবারের মতো আমেথিকে দাঁড়িয়েই চমক সৃষ্টি করেছেন। তার কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হতে যাচ্ছেন বিজেপির প্রভাবশালী নেত্রী স্মৃতি ইরানি।
ভারতের এনডিটিভি জানিয়েছে, সর্বশেষ পাওয়া হিসাব অনুযায়ী কিশোরী লাল এগিয়ে রয়েছেন ৭৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে। আমেথি ও রায়বরেলি সব সময়ই কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত। এই দুই আসনে গান্ধী পরিবারের রয়েছে বিশাল জনপ্রিয়তা ও ঐতিহ্য। অথচ গত ২৫ বছরের মধ্যে এবার প্রথম আমেথিতে নেই গান্ধী পরিবারের কোনো প্রার্থী। এই নির্বাচনে আমেথি ছেড়ে রায়বরেলিতে প্রার্থী হয়েছেন রাহুল গান্ধী। সেখানেও তিনি বিজয়ে পথে।
গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমেথির নাম। এই পরিবারের চারজন সদস্য এই আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন, যাদের মধ্যে ছিলেন রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীও। এছাড়া সঞ্জয় গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী নির্বাচিত হয়েছেন এই আসনে।
তবে এবার আমেথি থেকে রাহুলের সরে যাওয়ায় নিয়ে নানা জল্পনার সঙ্গে ডালপালা মেলে গুজব আর অনুমান। জরিপে আগেই বলা হয়, আমেথিতে এবার কংগ্রেসের বিজয়ের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। আর সেই হিসাব ধরেই গান্ধী পরিবারের কেউ সরাসরি প্রার্থী না হয়ে, আসনটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যিনি বিজেপির কাছ থেকে উদ্ধার করে আনতে পারবেন আমেথিকে। আর সে কাজটিই সফলভাবে করে দেখিয়েছেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ কিশোরী লাল শর্মা।
রাহুল সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর, আমেথির জন্য প্রথমে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তাই অভিজ্ঞ কিশোরী লাল শর্মাকে আমেথির জন্য বাছাই করা হয়। কারণ, উত্তরপ্রদেশে গতবারের ভয়াবহ ভরাডুবির স্মৃতি এবার ভুলতে চায় কংগ্রেস।
২০১৯ সালে উত্তরপ্রদেশের ৮০ আসনের মধ্যে একমাত্র রায়বরেলিতে জয়লাভ করেন সোনিয়া গান্ধী। আমেথিতে স্মৃতির কাছে রাহুল হারেন ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। সেই ভরাডুবির জন্য বিশেষ করে রাহুল গান্ধীর পরাজয়ের জন্য দলের পক্ষ থেকে কিশোরী শর্মাকে দায়ী করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছিল। তবে সে দফায় তাকে রক্ষা করেন সোনিয়া ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।
রাজীব গান্ধীর সময় থেকেই গান্ধী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ। রাজীবের মৃত্যুর পর গান্ধী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। রাহুল সংসদ সদস্য থাকার সময় তার প্রতিনিধি হিসেবে কিশোরী লালই আমেথির কাজকর্ম দেখতেন। রায়বরেলিতেও সোনিয়া গান্ধীর প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেছেন তিনি।
রাজনীতি আর গান্ধী পরিবার সূত্রেই আমেথি ও রায়বরেলিতে পরিচিত মুখ কিশোরী লাল শর্মা। পাঞ্জাব থেকে তাকে আমেথিতে নিয়ে আসেন প্রয়াত রাজীবই। তখন তিনি এই কেন্দ্রের সংসদ সদস্য। সেই থেকে আমেথিতে গান্ধী পরিবারের সব ধরনের কাজকর্ম দেখভাল করতে শুরু করেন কিশোরী লাল শর্মা।
১৯৮১ সালে রাজীব গান্ধী পূর্ব উত্তরপ্রদেশের এই আসনে নাম লেখালেও, ১৯৭৭ সালে এই আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন রাজীবের ভাই সঞ্জয় গান্ধী, তবে জিততে পারেননি। তিন বছরের মধ্যেই ১৯৮০-র লোকসভা ভোটে আমেথিতে জয়ী হন সঞ্জয়। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর পরে উপনির্বাচনে জিতেন রাজীব।
আবার প্রথমবার লোকসভার লড়াইয়ে দাঁড়ানোর পর সোনিয়া গান্ধীকে আমেথি চিনতে সাহায্য করেছিলেন এই কিশোরী লাল শর্মাই। আসনটি রাহুল গান্ধীর জন্য ছেড়ে যখন সোনিয়া গান্ধী রায়বরেলিতে যান, তখনও আমেথির দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন কেএল শর্মাই।
জল্পনা ছিল এবার লোকসভা নির্বাচনেও রাহুল ফিরতে পারেন আমেথিতে। কিন্তু কংগ্রেসের কাছে মনে করে, এই আসনে কঠিন লড়াই হবে। স্মৃতি ইরানি সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। সেখানে জিততে হলে প্রচারে ঝড় তুলতে হবে। কিন্তু সেটি গান্ধী পরিবারের সদস্যদের পক্ষে সম্ভব নয়।
গান্ধী পরিবারের সদস্যরা এ কেন্দ্রে প্রার্থী হলে দেশজুড়ে প্রচার করার সুযোগ থাকবে না। এ কারণেই আমেথি এলাকায় থাকা কিশোরীকে প্রার্থী করা হয়েছে। তার হয়ে প্রচারে নামেন গান্ধী পরিবারের সদস্যরা। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভোটের আগেই বলেন, কেএল শর্মাকে ৪০ বছরের জনসেবার পুরস্কার দেবে মানুষ।