এশিয়ায় যুদ্ধের দামামা, চীন-জাপান সম্পর্কের অবনতি

তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে এশিয়ার দুই মহাশক্তি চীন ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক লড়াই এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক প্রস্তুতির রূপ নিয়েছে।

তাইওয়ানের প্রতি জাপানের সমর্থন ও জাপানের পুনঃসামরিকীকরণের অভিযোগে ৪০টি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীন। এর জবাবে জাপানও তাইওয়ানের কাছে একটি দ্বীপে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাপানের ২০টি কোম্পানিকে ‘রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায়’ ও আরও ২০ কোম্পানিকে নজরদারিতে রেখেছে। এর ফলে মিৎসুবিশি, কাওয়াসাকি এবং ফুজিৎসুর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সহযোগী সংস্থাগুলো এখন থেকে চীন থেকে কোনো ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ পণ্য আমদানি করতে পারবে না। এই পণ্যগুলো সাধারণত বেসামরিক এবং সামরিক, উভয় কাজেই ব্যবহৃত হয়।

নজরদারিতে থাকা সুবারু কর্পোরেশন এবং মিৎসুবিশি মেটেরিয়ালসের মতো কোম্পানিগুলোকে এখন চীন থেকে পণ্য আমদানির জন্য বিশেষ লাইসেন্স এবং এই মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তারা এই পণ্যগুলো জাপানি সামরিক বাহিনীর কাজে ব্যবহার করবে না। চীনের দাবি, জাপানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সামরিকীকরণ রুখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
চীনের এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে টোকিও। জাপানের ডেপুটি চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি কেই সাতো বলেন, আমরা চীনের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

এদিকে, জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি এক বিস্ফোরক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, পাঁচ বছরের মধ্যে তাইওয়ান থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘ইয়োনাগুনি’ দ্বীপে শক্তিশালী ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে জাপান। এই পদক্ষেপ তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের আধিপত্য রুখতে জাপানের দৃঢ় সংকল্পেরই বহিঃপ্রকাশ।

ছবি: সংগৃহীত
এই সংকটের সূত্রপাত হয় ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর, যখন জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পার্লামেন্টে তাইওয়ান ইস্যুতে একটি মন্তব্য করেন। তিনি বলেছিলেন, চীন যদি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তাইওয়ান দখল করার চেষ্টা করে, তবে সেটি জাপানের জন্য অস্তিত্ব রক্ষায় হুমকিস্বরূপ পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য হতে পারে। জাপানি আইন অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে জাপান বন্ধু রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে সাহায্য করতে বাধ্য।

চীন এই মন্তব্যকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখেছে। এর ফলে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এতটাই ঘটেছে যে, ২০২৬ সালের শুরুতে জাপান তাদের শেষ দুটি জায়ান্ট পান্ডা চীনে ফেরত পাঠিয়েছে। অন্যদিকে চীন জাপানি সামুদ্রিক খাবার আমদানিতে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং জাপানে ভ্রমণের ওপর সতর্কতা জারি করেছে, যার ফলে প্রায় ৫ লাখ ফ্লাইট বুকিং বাতিল হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে জাপানে চীনা পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৬০.৭ শতাংশ কমে গেছে।

 
পান্ডা কূটনীতি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, চীন ও জাপানের মধ্যকার এই লড়াই এখন শুধু কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জাপানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে বেইজিং, অন্যদিকে সামরিক শক্তি বাড়িয়ে পাল্টাপাল্টি জবাব দিচ্ছে টোকিও। এই উত্তেজনা প্রশমিত না হলে তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।