গত বছরের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং অস্থিরতার পর অবশেষে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নেপালে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই বিক্ষোভের ফলে পার্লামেন্ট ভেঙে যাওয়ার পর এই নির্বাচনের মাধ্যমে নেপালের নাগরিকরা তাদের নতুন প্রতিনিধি ও সরকার নির্বাচন করছেন। হিমালয় কন্যা নেপালের রাজনীতিতে এই নির্বাচনকে একটি 'সন্ধিক্ষণ' হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আধিপত্যের মুখে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে এক শক্তিশালী যুব আন্দোলন।
নেপালের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩ হাজার ৬৮৯ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট ২৭৫টি আসনের ভাগ্য নির্ধারিত হবে এই ভোটে।
নেপালের নির্বাচন পদ্ধতি মূলত দুই স্তরের। ১৬৫টি আসনে সরাসরি ভোট হবে। এর জন্য ৩,৪০৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাকি ১১০টি আসন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। ভোটগ্রহণের জন্য সারাদেশে ২৩ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক হলো ৭৪ বছর বয়সী বর্ষীয়ান মার্ক্সবাদী নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিপক্ষে ৩৫ বছর বয়সী জনপ্রিয় র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ’র সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অলি তার দীর্ঘদিনের দুর্গ ঝাপা-৫ আসন থেকে লড়ছেন, যেখানে বালেন শাহ রাস্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির হয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। বালেন শাহ তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক এবং তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে, নেপালের প্রাচীনতম দল নেপালি কংগ্রেসের নতুন নেতা ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। তিনি প্রবীণ নেতাদের 'ওল্ড এজ ক্লাব' বা বার্ধক্যকালীন রাজনীতি অবসানের অঙ্গীকার করেছেন। এতে করে দেশটির তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানা চেষ্টা করেছেন তিনি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এক পর্যায়ে বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেকারত্বের ক্ষোভে জ্বলে ওঠা সেই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সে সময় বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবন ও সরকারি সচিবালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, যা তৎকালীন অলি সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এরপর সুশীলা কার্কীর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার প্রধান কাজ ছিল ছয় মাসের মধ্যে এই নির্বাচন আয়োজন করা।
নেপালের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। হিমালয় এবং বরফে ঢাকা পাহাড়ি অঞ্চলের ব্যালট বাক্স সংগ্রহের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো কোনো দুর্গম গ্রামে মাত্র হাতেগোনা কয়েক জন ভোটারের জন্য কয়েক ডজন কর্মকর্তাকে তুষারপাত উপেক্ষা করে যেতে হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন প্রধান রাম প্রসাদ ভাণ্ডারী জানিয়েছেন, সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের ফলাফল ভোট গণনা শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘোষণা করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে সমানুপাতিক ব্যবস্থার ফলাফল চূড়ান্ত হতে আরও ২-৩ দিন সময় লাগতে পারে। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালের নির্বাচনে ফলাফল পেতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল।
নেপালের এই নির্বাচনের দিকে কড়া নজর রাখছে প্রতিবেশী ভারত ও চীন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সাথে ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই কিছুটা শীতল ছিল, কারণ তাকে চীনের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে, চীন নেপালে তাদের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী। আমেরিকাও ভারতের কৌশলগত অবস্থানের সাথে একাত্ম হয়ে এই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এই নির্বাচন কি প্রবীণ নেতাদের স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি জয়ী করবে, নাকি বালেন শাহের মতো তরুণ নেতৃত্বের হাতে নতুন নেপালের চাবিকাঠি তুলে দেবে? সাশি গুরুং-এর মতো সাধারণ ভোটারদের ভাষায়, এটি সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়, এটি নেপালিদের জন্য পরিবর্তনের সূচনা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান